আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার মুহতামিম মুফতী আবু তাহের কাসেমী নাদভী রাহ. এর জীবনের শেষ রমজান ও তাঁর আখেরী বয়ান ”বয়ানের চেয়েও সুন্দর যে জীবন”

ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু মানুষের আগমন ঘটে, যাঁদের জীবন কোনো সাধারণ নিয়মে বাঁধা থাকে না। তাঁদের ওঠাবসা, জাগরণ আর ইবাদতের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে আসমানী আলোয় উদ্ভাসিত। উম্মাহর আকাবির ও আসলাফের সেই সোনালি ধারার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ এর সাবেক সভাপতি ও আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার মুহতামিম (রহ.)-এর জীবন ছিল তেমনই এক জীবন্ত কেরামত। বিশেষ করে পবিত্র রমজানুল মুবারক এলে তাঁর ভেতরের ইবাদতের আকুলতা ও কুরআনের প্রতি প্রেম যে রূপ ধারণ করত, তা কেবল চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করলেই বিশ্বাস করা সম্ভব।

১৪৪৭ হিজরীর সেই ঐতিহাসিক রমজান ছিল তাঁর জীবনের এক ভিন্ন অধ্যায়। অসুস্থ শরীর, ভাঙা মন আর অনন্ত সফরের প্রচ্ছন্ন হাতছানির মাঝেও তাঁর ইবাদতের হিমালয়সম দৃঢ়তা তরুণ সমাজকেও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। শারিক অসুস্থতা কোন কিছুই তাঁকে তারাবির দীর্ঘ কিয়াম এবং প্রতিদিন দশ পারা করে কুরআন শোনার অদম্য আগ্রহ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি যেন প্রমাণ করে গেছেন, আল্লাহর মহব্বত যখন অন্তরে পূর্ণতা পায়, তখন শরীরের সমস্ত ক্লান্তি আত্মার শক্তির কাছে পরাজয় বরণ করে।

পঞ্চম রমজানে জোহরের নামাজের পর জামিয়ার ছাত্র, শিক্ষক ও মুসল্লিদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর সেই ‘আখেরী বয়ান’ নিছক কোনো বক্তৃতা ছিল না; বরং তা ছিল এক স্নেহময় অভিভাবকের হৃদয়ের গভীর থেকে নিংড়ে আনা আখিরাতের পাথেয়।

হুজুর (রহ.)-এর সেই আখেরী পয়গাম, সুন্নতের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং কুরআনের এই রূহানী নেজামকে আমরা আমাদের ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে আজীবন ধারণ করব।

আল্লাহ তাআলা হুজুরকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং আমাদের সবাইকে তাঁর দেখানো সুন্নতি পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।

পঠিতব্য এই বিশেষ স্মৃতিকথা ও আখেরী বয়ানের মূল লেখাটি নিচে প্রকাশ করা হলো—আকরাম সা’দী

 

রমজান তাঁর জীবনে কেবল একটি মাস ছিল না; ছিল প্রেমাস্পদের সান্নিধ্যে ডুবে যাওয়ার এক ফলন্ত ঋতু। যেন একজন প্রেমমগ্ন বান্দা প্রেমসাগরের অতলে অবগাহন করছে, যেখানে দুনিয়ার সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে যায়, কেবল রবের আহ্বানই ধ্বনিত হতে থাকে শরীর ও আত্মার প্রতিটি শিরা-উপশিরায়।

রমজানের চাঁদ উদিত হওয়ার আগ থেকেই তাঁর ভেতরে এক অপার্থিব পরিবর্তন লক্ষ করা যেত। চেহারায় ফুটে উঠত প্রশান্ত উজ্জ্বলতা, দেহে দেখা দিত আশ্চর্য প্রাণশক্তি, অন্তরে জেগে উঠত ইবাদতের গভীর আকুলতা । তিনি যেন ধীরে ধীরে নিজেকে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে সরিয়ে কুরআনের জগতে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মনে হতো, এ মাস যেন তাঁর আত্মার প্রকৃত আবাস; এগারো মাস তিনি যার প্রতীক্ষায় থাকতেন, সে মাহে রমজান এসে তাঁর হৃদয়কে নতুন করে জাগিয়ে তুলতো।

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, মাহে রমজান আগমনের পূর্ব থেকেই রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও রমজানের জন্য  প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও প্রস্তুত করতেন। সেই সুন্নতেরই যেন জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিলেন তিনি। রমজান আসার পূর্ব থেকেই তাঁর আমলী প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত।

রমজানের পূর্বে তিনি হাফেজদের ডেকে নিতেন, তাদের উৎসাহিত করতেন এবং রমজানের জন্য প্রস্তুত হতে বলতেন। তাঁর দরদভরা কণ্ঠে উচ্চারিত হতো কুরআনের খিদমতের আহ্বান, আর সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে সৌভাগ্যবান হাফেজগণও নতুন উদ্যমে জেগে উঠতেন।

খাদেমকে ডেকে দায়িত্ব দিতেন তারাবির মাঝে হাফেজদের জন্য যেন প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ ও ভালো নাস্তার ব্যবস্থা রাখে। তাঁর কাছে তারাবির এ আয়োজন নিছক একটি নিয়ম বা আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং ছিল কুরআনের সাথে আত্মাকে একাকার করে দেওয়ার এক মহামুহূর্ত, এক রূহানী মহাসম্মেলন।

যখন রমজানের চাঁদ দেখা যেত, পৃথিবীর যাবতীয় ব্যস্ততা থেকে নিজেকে মুক্ত করে ইবাদতে নিবিষ্ট হতে চাইতেন। আজানের ধ্বনি কানে পৌঁছামাত্র নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া ছিল তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। রমজানে তাতে আরও যত্নশীল হতেন। এশার নামাজ আদায় করেই দ্রুত আগে থেকে প্রস্তুত রাখা তাঁর নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসতেন, সুন্নত আদায় করে দাঁড়িয়ে যেতেন তারাবির দীর্ঘ কিয়ামে।

তারাবির নামাজ ছিল তাঁর ইবাদতজীবনের এক বিস্ময়কর অধ্যায়। প্রথম দিন ১-৭তম পারা, দ্বিতীয় দিন ৮ থেকে ১৫তম পারা-এভাবে তৃতীয় এবং চতুর্থ তারাবিতে খতম সম্পন্ন হতো। এরপর আবার নতুনভাবে শুরু হয়ে প্রতি দিন দশ পারা করে তিন দিনে খতম শেষ। বিশ রমজান পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকত।

একুশে রমজান থেকে তিনি ইতিকাফে চলে যেতেন—দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেন কেবল তাঁর রবের সান্নিধ্যে আশ্রয় নিতেন। সেখানে তারাবি ও তাহাজ্জুদ মিলে প্রতি রাতে পনেরো পারা তিলাওয়াত হতো; দুই দিনেই একটি খতম সম্পন্ন হতো।

তারাবিতে প্রতিদিন বারো রাকাতের পর কিছু সময় বিশ্রাম নিতেন এবং হাফেজসাহেব ও মুসল্লিদের সাথে দীনি মুজাকারা করতেন। এরপর আগত সবাইকে নিয়ে নাস্তা করতেন।

আসরের পর হযরত মাদানী রহ. এর তরতীবে তিলাওয়াত শুনতেন। আওয়াবীনের নামাজেও কুরআন তিলাওয়াত শুনতেন; কখনো কখনো সেখানেও একটি খতম সম্পন্ন হতো।

এ দৃশ্য নতুন কিছু নয়; বরং উম্মাহর আকাবির ও আসলাফের জীবনধারারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যখনই কোনো হৃদয়ে আল্লাহর কালামের সত্যিকারের মহব্বত জেগেছে, তখন কুরআনের সাথে তার সম্পর্ক হয়ে উঠেছে নিঃশ্বাসের মতো অবিচ্ছেদ্য।

তিনি ছিলেন আকাবির ও আসলাফের প্রতিচ্ছবি। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম বুখারী রাহিমাহুমুল্লাহ থেকে শুরু করে শায়খুল হিন্দ, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রাহিমাহুমুল্লাহ ও শায়খুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী পর্যন্ত বিস্তৃত সেই সোনালি ধারার উত্তরসূরী।

পবিত্র রমজান মাসে ফজরের নামাজের পর অধিকাংশ মানুষ যখন বিশ্রামের প্রস্তুতি নিত, তখনও তিনি এশরাক পর্যন্ত জিকির-আযকারে নিমগ্ন থাকতেন। এশরাকের নামাজ আদায়ের পরই কেবল সামান্য বিশ্রাম গ্রহণ করতেন। তিনি বলতেন, “অন্য সময়ের তুলনায় রমজানে এশরাকের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ রমজান তো আমলের বসন্তকাল।” তাই রমজানেও এশরাক ও সকালবেলার আযকারের প্রতি তাঁর বিশেষ যত্ন ছিল।

কিন্তু তাঁর 1447 হিজরীর পবিত্র রমজানুল মুবারক ছিল কিছুটা ভিন্ন। অভ্যন্তরীন বিভিন্ন বিষয়ে তিনি ছিলেন বেদনাহত। সিঙ্গাপুর-মালেশিয়া সফরের ভিসা রেডি হয়েগেলেও তা নাকচ করেদেন। কেননা, সামনে তো তাঁর অনন্ত সফর। ভাঙা মন ও শরীর নিয়ে ১ম,২য় ও ৩য় তারাবী যথা নিয়মে পড়েছেন। ৪র্থ তারাবির দিন মাগরিবের পর ফোন এলো-খালাম্মা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, “আকরাম, তোমার হুজুরের শরীরটা খুব একটা ভালো না। আজ একটু কম পড়তে বলো। দ্রুত তারাবি শেষ করে যেন বাসায় এসে বিশ্রাম নিতে পারেন।”

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সত্যিই তাঁর শরীরে অসুস্থতার ছাপ স্পষ্ট ছিল। কিন্তু তাঁর অন্তর? না, সেখানে কোনো দুর্বলতা ছিল না। ইবাদতের প্রতি তাঁর আগ্রহ তখনও ছিল তরঙ্গময় সাগরের মতো প্রবল ও অদম্য।

আমি বহুবার ভেবেছি তাঁকে বলব-“হুজুর, আজ আপনার শরীর ভালো নয়, হাফেজদেরকে একটু কম পড়তে বললে ভালো হয়।” তারাবি শুরুর আগেই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছি কথাটি বলব, কিন্তু তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়ে সে সাহস আর হলো না। মনে হলো, এ কথা বলা যেন এক ইবাদতপিপাসু আত্মাকে তার প্রেমাস্পদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা।

তিনি যথারীতি দাঁড়িয়ে গেলেন তারাবিতে। হাফেজ সাহেবগণ তিলাওয়াত শুরু করলেন। একের পর এক পারা শেষ হচ্ছে, দীর্ঘ কিয়াম চলছে। প্রতি দুই রাকাতে দু’পারা শেষ করে একেকজন হাফেজ পরিবর্তন হচ্ছে। এভাবে বিশ রাকাতে দশ পারা তিলাওয়াত সম্পন্ন হলো। আর তিনি? স্থির, অবিচল, তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। অসুস্থতার কোনো ছাপ তাঁর চেহারায় নেই। তিনি তাগড়া নওযোয়ানের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কুরআন শুনেছেন। মনে হচ্ছিল, তিনি কুরআন শুনছেন না-বরং তাঁর আত্মা কুরআনের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।

আমরা যারা তরুণ, সুস্থ-সবল, তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমাদের মাঝে মাঝে বসে পড়তে হচ্ছিল। অথচ তিনি, সেই অসুস্থ শরীর নিয়েও একবারের জন্যও বসেননি। কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো অবসাদ নেই; যেন শরীরের সমস্ত দুর্বলতা তাঁর আত্মার শক্তির কাছে পরাজিত হয়ে গেছে।

সেদিন তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল-এ মানুষটি কেবল ইবাদত করেন না; তিনি ইবাদতের মধ্যেই জীবন কাটান। তাঁর কাছে কুরআন কেবল তিলাওয়াতের গ্রন্থ ছিল না, বরং ছিল হৃদয়ের জীবনধারা। তাঁর রমজান ছিল নিছক রোজা ও তারাবির সমষ্টি নয়; বরং ছিল প্রভুপ্রেমে নিমগ্ন এক আত্মার অনন্ত সফর।

এমন মানুষদের দেখলে বোঝা যায়-আল্লাহর প্রেম যখন কোনো হৃদয়ে সত্যিকার অর্থে স্থান করে নেয়, তখন দুর্বল শরীরও অদম্য শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে, ক্লান্ত মানুষও পাহাড়সম দৃঢ়তায় দাঁড়িয়ে থাকে, আর দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সব কষ্ট বিলীন হয়ে যায় রবের সন্তুষ্টির সামনে।

রাত প্রায় দেড়টায় তারাবির নামাজ শেষ হলো। তিনি ধীর পায়ে বাসার দিকে রওনা হলেন। আমি কিছুদূর এগিয়ে দিলাম। পথ চলতে চলতেই জামিয়ার অবস্থা নিয়ে কিছু কথা বললেন। বললেন, শেষ রাতের জিকির ও দোয়ার মধ্যে সবকিছুর হল ও সমাধান আছে। বললেন, শেষ রাতে সবাইকে হালকায়ে জিকির দোয়া ও মুনাজাতে শরিক হতে উদ্বুদ্ধ করতে। তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল জামিয়ার প্রতি অকৃত্তিম দরদ ও ব্যাকুলতা।

পবিত্র রমজান মাসে ফজরের নামাজ আদায় করে অধিকাংশ মানুষ যখন বিশ্রামের প্রস্তুতি নিতেন, তখনও তিনি মুসাল্লায় অবিচল বসে থাকতেন। জিকির, তিলাওয়াত, দুআ ও মুরাকাবায় কাটিয়ে দিতেন সূর্যোদয় পর্যন্ত দীর্ঘ সময়। এরপর ইশরাকের নামাজ আদায় করেই তবে কিছুক্ষণ বিশ্রামে যেতেন। তিনি বলতেন, “অন্য সময়ের তুলনায় রমজানে ইশরাকের আমলের গুরুত্ব আরও বেশি হওয়া উচিত। কেননা রমজান তো আল্লাহর বিশেষ রহমতের মাস; এ মাসের প্রতিটি নেক আমলের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।”

পরদিন, পঞ্চম রমজান। বিশ্রাম শেষে প্রায় এগারোটার দিকে শেষ বারের মত তিনি কার্যালয়ে এলেন। এসেই নিয়মিত আ’মল হিসেবে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিলাওয়াত চলল। আমি কয়েকবার বেশ কিছু প্রয়োজনীয় কাজে তাঁর কাছে গিয়েও ফিরে এলাম। কারণ তিনি তিলাওয়াতে গভীর মনোযোগে নিমগ্ন ছিলেন। তিলাওয়াতের সেই পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগত-গভীর, নিবিষ্ট, আত্মাভেদী। রুমটিতে যেন আসমানী সকীনার বৃষ্টি অবতীর্ণ হচ্ছে। কণ্ঠের ভারী সুর হৃদয়ের গভীরে গিয়ে আঘাত করছিল । মনে হচ্ছিল, প্রতিটি আয়াত যেন তাঁর অন্তর থেকে উৎসারিত হয়ে আবার অন্তরেই ফিরে যাচ্ছে।

তিলাওয়াত শেষ করে আমাকে ডাকলেন। আমি প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেরে নিলাম। এরপর জোহরের আযান হলো। তিনি দ্রুত উঠে প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন, মসজিদে গেলেন এবং নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে ছাত্র, শিক্ষক ও উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে নসীহতপূর্ণ বয়ান পেশ করলেন।

সংক্ষিপ্ত খোতবা শেষে বলতে শুরু করলেন, “রমজানের দিনগুলো খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে 4-5টি রোজা শেষ হয়ে গেল। এভাবে পুরো রমজান শেষ হয়ে যাবে। রমজান মাস আসতে দেরি হয়, কিন্তু চলে যেতে দেরি হয় না। তাই এই মুবারক মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে।

রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত যারা ই‘তিকাফে বসেছেন, তাদের জন্য আমরা আ’মলের বিশেষ একটি নেজাম চালু করেছি। এতে তালিম, কিরাত মাশক,মাসয়ালা-মাসয়িলের মুজাকারা ইফতারের আগে এবং সাহরী ও তাহাজ্জুদের পর দোয়ার আমল, পাশাপাশি হালকায়ে জিকির। আখেরি আশরার এই সময়টাকে ২৪ ঘণ্টা আমলের পরিবেশে রাখার চেষ্টা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

সকাল 10 টা থেকে ১১টা থেকে পর্যন্ত এ তালিম চলবে। ১১টা থেকে ১২টা মাসয়ালা-মাসয়িলের মুজাকারা।  ই‘তিকাফে অবস্থানরত সবাইকে এতে শরিক করার জন্য তাবলিগের দায়িত্বশীল ও ছাত্র ভাইয়েরা সহযোগিতা করবেন, যেন সকলে সহজভাবে আমলের পরিবেশে যুক্ত থাকতে পারেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-কিরাত শুদ্ধ করার মাশক। অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন, যাদের কিরাত এখনো সহিহ হয়নি। তাই আমাদের আরজ হলো-নামাজ জীবনের সবচেয়ে বড় আমল। কিন্তু কিরাত যদি সহিহ না হয়, সূরা ফাতিহা সহিহ না হয়, নামাজও সহিহ হবে না। এজন্য কিরাত শুদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।

আমরা কিরাতের জন্য দায়িত্বশীল মুজাওয়িদ ঠিক করেছি। আপনারা সবাই তাতে শরিক হবেন। তালিমে বসবেন। তালিমের মাধ্যমে কলব নূরানী হবে, কিরাতের মাধ্যমে কলব আলোকিত হবে। তখন বাকি আমলগুলোও সহজ হয়ে যাবে। যোহরের আগে পৌনে একটা পর্যন্ত এ আমল চলবে। এরপর অজু ও ইস্তিঞ্জার সময় থাকবে। যোহরের পরে সুন্নতের মাশক হবে।

আমরা নামাজ পড়ি, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নত অনুযায়ী নামাজ কতটুকু আদায় করি-এটা ভাবার বিষয়। নামাজের মধ্যে মোটামুটি চারটি দিক রয়েছে—ফরায়েজ, ওয়াজিবাত, সুনান ও খুশু-খুজু (আদাবে সালাত)। সব মিলেই নামাজ পূর্ণতা লাভ করে। কোনো ফরজ ছুটে গেলে নামাজই শুদ্ধ হয় না, আর কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে সিজদায়ে সাহু বা পুনরায় নামাজ আদায় করতে হয়।

নামাজ কবুলের ক্ষেত্রে সুন্নত ও খুশু-খুজুর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। নামাজে প্রায় ৫১টি সুন্নত রয়েছে-কিয়ামে ১১টি, কিরাতে ৭টি, রুকুতে ৮টি, সিজদায় ১২টি এবং শেষ বৈঠকে ১৩টি সুন্নত। তাই নামাজকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নত অনুযায়ী পরিপূর্ণভাবে আদায় করা জরুরি, এবং এ বিষয়ে নিয়মিত আমলী মশক করা উচিত।

রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বয়ং জিবরাইল আমীন আলাইহিস সালাম থেকে নামাজের আমলী মশক করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে নামাজের আমলী মশক করিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম থেকে তাবেঈন, তাবে তাবেঈন হয়ে আজ পর্যন্ত নামাজের  এই আমলী মশক সারা দুনিয়ার উম্মতের মাঝে চলে আসছে।

আমাদের জামিয়ার সাবেক শায়খুল হাদিস হযরত মীর সাহেব হুজুর রহ. আসরের নামাজের পর সকলকে বসিয়ে নামাজের আমলী মশক করাতেন। তিনি দেখিয়ে দিতেন-কিভাবে নামাজ আদায় করতে হবে, কিভাবে হাত উঠাতে হবে, কিভাবে রুকু করতে হবে, সিজদা করতে হবে। এভাবে বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নামাজের সুন্নতকে জীবন্ত করে তুলতেন।

একবার আমরা সকলে মেহমানখানায় উপস্থিত ছিলাম। সেখানে হযরত ইমাম সাহেব হুজুর রহ.ও উপস্থিত ছিলেন। হযরত বোয়ালভী সাহেব হুজুর রহ. ইমাম সাহেব হুজুর রহ.-কে উদ্দেশ্য করে বললেন-(যেহেতু তিনি তাঁর শাগরেদ ছিলেন) “হুজুর, আমি নামাজের জন্য  হাত উঠাচ্ছি, এটা সুন্নত অনুযায়ী হচ্ছে কিনা একটু দেখে দিন। আমি রুকু করছি, সুন্নত মুতাবেক হচ্ছে কিনা একটু লক্ষ্য করুন।” এ থেকেই বোঝা যায়, আকাবিরদের মধ্যে নামাজের সুন্নতের প্রতি কত গভীর ফিকির ও সতর্কতা ছিল।

হযরত হাকিমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত আশরাফ আলী থানভী রহ. এর সর্বশেষ খলীফা হযরত মুহিউস সুন্নাহ শাহ আবরারুল হক রহ.-এর মজলিসে আমি বারবার গিয়েছি। মুফতী শামছুদ্দীন জিয়া সাহেবসহও সেখানে গিয়েছি। সেখানেও আমরা এ আ’মলী মশক প্রত্যক্ষ করেছি। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর (সপ্তাহে দুয়েকদিন নয় প্রতিদিন) নিয়মিতভাবে ছাত্র ও আসাতিযায়ে কেরামকে নিয়ে নামাজের বিভিন্ন অংশের বাস্তব অনুশীলন করাতেন-কিভাবে রুকু, সিজদা ও অন্যান্য আমল নবীজী ﷺ-এর সুন্নত অনুযায়ী আদায় করতে হয়, তা হাতে-কলমে শিক্ষা দিতেন তিনি।

সেখানে দেশ-বিদেশের বড় বড় মুফতী ও মুহাদ্দিস এবং  ইউরোপ,আফ্রিকা, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বড় বড়  মাদরাসার মুহতামিমগণ উপস্থিত হতেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে তিনি বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেন  “تم تو بڑے محدث ہیں لیکن سنت کے مطابق نماز نہیں”  “تم تو بڑے مفتی ہو لیکن سنت کے مطابق نماز نہیں” (তোমরা তো বড় মুফতি, কিন্তু সুন্নত অনুযায়ী নামাজ নেই; তোমরা তো বড় মুহাদ্দিস, কিন্তু সুন্নত অনুযায়ী নামাজ নেই।)

আজ আমরা দেখি, কেউ একভাবে হাত বাঁধছে, কেউ আরেকভাবে। রুকু, সিজদা, হাত ওঠানো-সবকিছুরই সুন্নতি তরিকা আছে। অথচ আমরা সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছি না।

মনে রাখতে হবে, কিয়ামতের ময়দানে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। নামাজ ঠিক থাকলে অন্যান্য আমলও সহজ হবে। আর নামাজ নষ্ট হলে বাকি ক্ষেত্রে বিপদে পড়বে।

আমাদের সুফি সাহেব হুজুর সুন্নতের আশেক। সুন্নতের বিষয়ে ‍গুরত্ব দেন। বিশেষ মেহনত করেন। তিনি ইতিকাফে বসেছেন। তাই তিনি প্রতিদিন যোহরের নামাজের পরে সুন্নতের মুজাকারা করাবেন এবং নামাজের আ’মলী মাশক করাবেন। আমরা শুধু শুনেই ক্ষান্ত হব না; বরং এসব আমলের মাশকের মধ্যে শরিক হব। কারণ অনেক সময় নামাজের আমল ও মাসনূন তরীকাগুলো আমরা সঠিকভাবে জানলেও মশক না করার কারণে আ’মল করি না। তাই এই মাশকের মাধ্যমে সহীহ ও সুন্দর করে আ’মলে আনতে হবে।

এখানে মুজাকারায় সময়ের উপযোগী আমলের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হবে। মসজিদে প্রবেশ করার পাঁচটি সুন্নত আছে, বের হওয়ারও পাঁচটি সুন্নত আছে। আমরা চেষ্টা করব-এই সুন্নতগুলোর ওপর খেয়াল রেখে আমল করতে। একটি সুন্নতের ওপর আ’মল করলে দশটি করে নেকি পাওয়া যায়। একজন মুসল্লী যদি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য মসজিদে আসে, তাহলে শুধু মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুন্নতের ওপর আমল করার মাধ্যমেই প্রতিদিন প্রায় পাঁচ শত নেকি অর্জন করতে পারেন। এভাবে প্রতি মাসে প্রায় পনের হাজার নেকি এবং বছরে প্রায় এক লক্ষ আশি হাজার নেকি তার অর্জিত হবে। সুবহানাল্লাহ! এই বিশাল নেকি শুধু মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সামান্য খেয়াল রাখলেই অর্জন করা যায়। কিন্তু আমরা বেখেয়ালি ও গাফলতির কারণে কত বড় নেকি থেকে মাহরুম হয়ে যাচ্ছি!

আমরা চেষ্টা করব-মসজিদে প্রবেশের সুন্নত, খাওয়া-দাওয়ার সুন্নত, ঘুমের সুন্নত, সালামের সুন্নত-জীবনের প্রতিটি কাজে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নত অনুযায়ী চলতে। কারণ প্রতিটি আ’মলের মধ্যেই রাসূল ﷺ-এর আদর্শ রয়েছে। সুন্নতকে বাদ দিয়ে আমরা যত আমলই করি না কেন, সেই আমলের পূর্ণ রূহ ও বরকত অর্জিত হয় না, আর আল্লাহর দরবারে আমলের কবুলিয়তের জন্য সুন্নতের অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই পবিত্র রমজান মাসে আমরা আমাদের সময়কে হেফাজত করব, গাফলতের মধ্যে কাটাব না। এখানে তারাবির মধ্যে কুরআন তিলাওয়াত হবে। আমরা মনোযোগ দিয়ে সেই তিলাওয়াত শুনব এবং পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও যতটুকু পারি কুরআন তিলাওয়াত করব।

আমাদের আকাবির ও বুযুর্গদের জীবনী পড়লে বিস্মিত হতে হয়। ইমাম আবু হানিফা রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি রমজানে ৬১ বার কুরআন খতম করতেন।  ইমাম বুখারী রহ. রমজানে ৩০ খতম পর্যন্ত কুরআন তিলাওয়াত করতেন। হযরত ইয়াহইয়া রহ. হযরত শায়খুল হাদীস রহ. -এর আব্বা দিনে এক খতম করতেন। আমরা যদি আন্তরিক চেষ্টা করি, তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও তাঁদের অনুসরণ করতে পারব।

আমরা হয়তো মুরুব্বীদের মতো এত বেশি আমল করতে পারব না; কিন্তু অন্তত যতটুকু সময় পাই, কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে কাটানোর চেষ্টা করব। তারাবির মধ্যে হতে পারে, আওয়াবীনের মধ্যে হতে পারে, তাহাজ্জুদের মধ্যেও হতে পারে। হযরত শায়খুল হিন্দ রহ.-কে কেউ আওয়াবীনের মধ্যে কুরআন শুনাতো। কয়েকজন হাফেজ তাঁকে তারাবিতে কুরআন শুনাতেন, আবার কয়েকজন তাহাজ্জুদের মধ্যেও শুনাতেন।

হযরত থানভী রহ. লিখেছেন: “حفاظ بدلتے جا رہے ہیں، یہ بوڑھے کھڑے ہیں” অর্থাৎ, হাফেজ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এই বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে কুরআন শুনছেন।

শাইখুল হাদীস রহ. সম্পর্কে জীবনীতে লেখা আছে-রমজান এলে তিনি প্রায় সব কাজ কমিয়ে দিয়ে শুধু কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল থাকতেন। বহু মানুষ তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য আসতেন; কিন্তু তিনি তিলাওয়াতে এমন ডুবে থাকতেন যে দুনিয়ার অন্য কোনো দিকেই খেয়াল থাকত না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর কেউ কেউ বিস্মিত হয়ে বলতেন: “رمضان ہمارے یہاں بھی آتا ہے اور تمہارے یہاں بھی آتا ہے” রমজান তো আমাদের কাছেও আসে, আপনাদের কাছেও আসে; কিন্তু আপনারা যেভাবে কুরআনের সাথে সময় কাটান, আমরা তো সেভাবে পারি না। আপনারা ২৪ ঘণ্টাই কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন।

আমাদের মুরুব্বীদের হালাত দেখলে আশ্চর্য লাগে, আর আমরা গাফলতের মধ্যে সময় কাটিয়ে দিচ্ছি। তাই অন্যান্য আ’মলের পাশাপাশি আমরা যতটুকু পারি কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে সময় দিব। কারণ রমজান হলো কুরআনের মাস। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: ﴿شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ﴾ রমজান সেই মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে-যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী।

আজ আমরা অনেক সময় মোবাইল, ফেসবুক, গীবত ও অনর্থক কথাবার্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। অথচ আমাদের চিন্তা করা উচিত-আমার আখিরাতের কী হবে? মৃত্যুর পর কবরের কী হবে? হাশরের ময়দানে কী হবে? কিয়ামতের দিন কী হবে? আমি জান্নাতে যেতে পারব কি না? জাহান্নাম থেকে বাঁচতে পারব কি না?

অমুক কী করল, তমুক কী বলল-এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকার কী লাভ? কিয়ামতের ময়দানে কি এসব বিষয়ে আমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে? বরং আল্লাহ তাআলা আমাদের আমল, আমাদের চোখ, কান, জবান ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন।

﴿إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْؤُولًا﴾ আল্লাহ আমাকে হাত দিয়েছেন-আমি কি ইচ্ছামতো তা ব্যবহার করতে পারব? আল্লাহ আমাকে জবান দিয়েছেন-আমি কি যা খুশি তাই বলব? আল্লাহ আমাকে চোখ দিয়েছেন-আমি কি যা ইচ্ছা তাই দেখব? না, প্রতিটি বিষয়ের হিসাব দিতে হবে।

তাই বলি-আল্লাহকে ভয় করুন! আল্লাহকে ভয় করুন! আল্লাহকে ভয় করুন! রমজান মাসের কদর করুন। কুরআনের সাথে সম্পর্ক মজবুত করুন। গাফলত থেকে বেঁচে থাকুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমল করার, সুন্নতের ওপর চলার এবং রমজানের হক আদায় করার তাওফীক দান করুন।

এটিই ছিল জামিয়ার ছাত্র-শিক্ষক ও মুসল্লিদের উদ্দেশে তাঁর করা আখেরী বয়ান। যা একজন স্নেহময় অভিভাবকের হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত উপদেশমালা-তিনি যা বলতেন, তার চেয়েও বেশি তা নিজের জীবনে ধারণ করতেন।” তাঁর প্রতিটি বাক্যে ছিল আমলের দাওয়াত, ইখলাসের সুবাস এবং আখেরাতমুখী জীবনের বাস্তব শিক্ষা।

আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print