ইলমে দ্বীনের গুরুত্ব ও ফজিলত

গত ৪ জুন ২০২৬ খ্রি. সোমবার আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসাতিযায়ে কেরাম ও তালিবুল ইলমদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক তারবিয়াতী ও ইসলাহী বয়ান পেশ করেন অত্র জামিয়ার স্বনামধন্য মুহতামিম হযরত আল্লামা মুফতী একরাম হোসাইন অদুদী (দা. বা.)। হযরতের মুখনিসৃত সেই পবিত্র আলোচনা আমাদের অন্ধকার হৃদয়ে জ্বালবে শুভ্র-সফেদ আলো; উদ্ভ্রান্ত মন খুঁজে পাবে সঠিক পথের দিশা এবং গাফেল হৃদয়ে ফুটবে ঈমান ও আমলের সুবাসিত ফুল। সেই বিবেচনায়, মুহতারামের বয়ানের মূল্যবান চুম্বকাংশ  পাঠকদের উদ্দেশ্যে পেশ করা হলো।

গ্রন্থনা ও শ্রুতিলিখন: মাওলানা আকরাম সা’দী

الحمد لله، الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فهو المهتد، ومن يضلل فلن تجد له وليًّا مرشدًا.

ونشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، ولا مثيل له، ولا وزير له، ولا مشير له في الخلق والأمر ونشهد أن سيدنا ومولانا محمدًا عبده ورسوله، المبعوث إلى الأسود والأحمر، الموصوف بشرح الصدر، صلى الله تعالى عليه وعلى آله وأصحابه الذين هم خلاصة العرب اربعة، وخير الخلائق بعد الأنبياء، وهم نجوم الهداية للاقتداء والاهتداء.

أما بعد، فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم، بسم الله الرحمن الرحيم:

﴿يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ﴾ وقال رسول الله ﷺ: إن الملائكة لتضع أجنحتها لطالب العلم رضًا بما يطلب أو كما قال النبي ﷺ. صدق الله مولانا العظيم، وبلغ رسوله النبي الكريم، ونحن على ذلك لمن الشاهدين والشاكرين.

সম্মানিত আসাতিযায়ে কেরাম ও আজিজ তলাবা! আমি আপনাদের সম্মুখে খুতবা ও দুরুদের পরে কুরআন শরীফের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি এবং একটি হাদিস পাঠ করেছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মেহেরবানি বর্ষিত হলে আপনাদের সম্মুখে এ বিষয়ে কিছু আলোচনা করব। আমরা এখানে যে দ্বীনি ইলম তলব করার জন্য এসেছি, এই দ্বীনি ইলম হলো মানুষের ইজ্জত, সম্মান ও মর্যাদার মূল চাবিকাঠি।

ইলমের কারণে হযরত আদম (আঃ) এর শ্রেষ্ঠত্ব

আম্বিয়ায়ে কেরামকে আল্লাহ তাআলা মুআযযায, মোকাররম ও সম্মানিত বানিয়েছেন ইলমের কারণে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যখন সর্বপ্রথম হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করলেন, আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বললেন, “আমি জমিনে আমার প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।” তখন ফেরেশতারা প্রশ্ন করল, “আপনি জমিনের মধ্যে এমন এক জাতি সৃষ্টি করবেন যারা দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও রক্তপাত করবে?” কুরআনের ভাষায়:

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً ۖ قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ ۖ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ ۖ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ

“আর সে সময়কে স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি (খলীফা) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।’ তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে সেখানে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা তো আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করি এবং আপনারই পবিত্রতা বর্ণনা করি।’ তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এমন কিছু জানি, যা তোমরা জান না।’” (সূরা আল-বাকারা: ৩০)

এরপরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করলেন এবং তাকে সমস্ত জিনিসের নাম শিক্ষা দিলেন। তারপর ফেরেশতাদের ডেকে বললেন, “তোমরা সত্যবাদী হলে এই জিনিসগুলোর নাম বলো।” ফেরেশতারা অপারগতা প্রকাশ করে বলল, “ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাদের যতটুকু শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই।”

তখন আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দিলেন নামগুলো বলতে। আদম (আঃ) এক এক করে সমস্ত জিনিসের নাম বলে দিলেন। তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে বললেন, “আমি কি বলি নি যে, আমি যা জানি তোমরা তা জানো না?” এরপর আল্লাহ তাআলা সবাইকে নির্দেশ দিলেন আদমকে সেজদা করার জন্য। সেখানে ইবলিশ ছিল, ফেরেশতারাও ছিল। ফেরেশতারা সবাই সেজদা করলেন, কিন্তু ইবলিশ অহংকার করে সেজদা করল না।

সুতরাং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আদম আলাইহিস সালামকে যে এই বিশাল সম্মান দিলেন এবং মুআযযায ও মোকাররম করলেন, তার মূল কারণ ছিল আল্লাহ প্রদত্ত সেই ‘ইলম’।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও ইলমের মর্যাদা

আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন:

وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ ۚ وَكَانَ فَضْلُ اللهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا (এবং তিনি আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি জানতেন না। আর আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ অত্যন্ত বিশাল। সূরা আন-নিসা: ১১৩)

নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও মুআযযায ও মোকাররম বানানো হয়েছে ইলমের মাধ্যমে। তাঁর ওপর সর্বপ্রথম ওহী নাযিল হয়েছিল— ‘اقْرَأْ’ (পড়ুন)। সুতরাং, ইলমের কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আম্বিয়ায়ে কেরামকে সর্বোচ্চ সম্মান দান করেছেন। ইলমের কারণেই আল্লাহ পাক নবী আলাইহিস সালামকে এবং মানবজাতিকে মুআযযায ও মোকাররম বানিয়েছেন।

আমরা সেই ইলম তলবের জন্যই এখানে এসেছি। দুনিয়াতে মানুষ মালের (সম্পদের) দ্বারাও সম্মান পায়, আবার ইলমের দ্বারাও সম্মান পায়। কিন্তু মালের সম্মান সাময়িক; মাল চলে গেলে সম্মানও চলে যায়। পক্ষান্তরে, ইলমের সম্মান কখনো কমে না। যত বিতরণ করবে, ইলম তত বৃদ্ধি পাবে এবং সম্মানও তত বাড়বে। সরকারি চাকরি যারা করে, তাদেরকে বৃদ্ধ হয়ে গেলে রিটায়ার্ড (অবসর) করে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের এখানে বুড়ো হয়ে গেলেও কোনো রিটায়ার্ড নেই। আমাদের মাদরাসাগুলোতে একজন আলেম যত বৃদ্ধ হন, তার ইলম ও অভিজ্ঞতার গভীরতা তত বাড়ে; ফলে তার সম্মান ও মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়।

ইলমে দ্বীন নাজাতের উসিলা: হযরত ঈসা (আঃ) এর ঐতিহাসিক ঘটনা

এই ইলম হলো মানুষের নাজাত ও মুক্তির উসিলা। তাফসীরে কবীরে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাতু ওসসালামের একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণিত আছে।

তিনি একবার সকালবেলা এক রাস্তা দিয়ে চলছিলেন। চলতে চলতে কিছু দূর যাওয়ার পর একটি কবরস্থান অতিক্রম করছিলেন। যাওয়ার সময় তিনি (মোজেজার মাধ্যমে) অবগত হলেন, কবরের এক বাসিন্দাকে প্রচণ্ড আযাব দেওয়া হচ্ছে। বিকেলবেলা যখন তিনি ওই রাস্তা দিয়ে ফিরে আসছেন, তখন দেখলেন— একই কবর, একই মুর্দা, কিন্তু সেখানে আযাবের পরিবর্তে জান্নাতের নিয়ামত ও নূর চকমক করছে!

হযরত ঈসা (আঃ) অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়লেন এবং আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মোনাজাত করে জানতে চাইলেন, “হায় আল্লাহ! সকালবেলা যাকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে দেখলাম, বিকেল হতে না হতেই সে জান্নাতের নিয়ামত পাচ্ছে কেন?”

আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী আসলো, “হে ঈসা! এই বান্দা যাকে সকালবেলা আপনি দোযখের আগুনে শাস্তি পেতে দেখেছেন, সে দুনিয়াতে পাপাচারী ও বেআমল ছিল, তাই সে শাস্তির যোগ্য হয়েছিল। কিন্তু সে যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার স্ত্রী গর্ভবতী ছিল। সে মারা যাওয়ার পর পরবর্তীতে তার একটি পুত্রসন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। মা সন্তানটিকে লালন-পালন করেছেন। যখন সে সন্তান পড়াশোনার বয়সে উপনীত হয়, তখন তাকে দ্বীনি ইলম শেখানোর জন্য ওস্তাদের কাছে পাঠায়। আজ বিকেলবেলা সেই ওস্তাদ শিশুটিকে সর্বপ্রথম সবক দিয়েছেন: بِسْم اللهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ (আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু)।”

আল্লাহ তাআলা বললেন:

فاستحييت ان اعذب عبدي في بطن الارض وولده يذكرني على وجه الارض হে ঈসা! যার সন্তান জমিনের ওপর দাঁড়িয়ে আমার নামের জিকির করছে, আমার রহমান ও রহীম নামের পাঠ নিচ্ছে, জমিনের নিচে তার বাবাকে আমি জাহান্নামের আগুনে শাস্তি দিতে লজ্জা বোধ করছি। এই সন্তানের ইলম তলব করা ও বিসমিল্লাহ পড়ার বরকতে আমি তার বাবার সমস্ত গুনাহ মাফ করে জান্নাতের নিয়ামত দান করেছি।”

সুবহানাল্লাহ! আমরা ছাত্ররা যারা এখানে খাঁটি নিয়তে ইলম তলব করতে এসেছি, আমাদের উসিলায় আল্লাহ আমাদের পিতা-মাতার গুনাহখাতা মাফ করে দেবেন। তবে শর্ত হলো, নিয়ত খালেস হতে হবে; দুনিয়া কামানোর উদ্দেশ্যে ইলম শিখলে কোনো লাভ হবে না।

ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ও ইমাম মালেক (রহঃ) এর ইলমি সাধনা

অতীতের যুগে ইলম অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন ছিল এবং ইলম অন্বেষণকারীরা অনেক সম্মানিত ছিলেন। “আইম্মায়ে আরবাআ” বা চার ইমামের অন্যতম ইমাম হলেন ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশীয় । তিনি ছোটবেলাতেই এতিম হয়ে যান, কিন্তু অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। মক্কা শরীফে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে হাদিসের উচ্চ শিক্ষার জন্য তাঁর মনে মদীনা শরীফের ইমাম মালেক (রহঃ)-এর দরবারে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগল।

তিনি মক্কা শরীফের গভর্নরের কাছে গিয়ে একটি সুপারিশপত্র নিলেন। মক্কা শরীফের গভর্নর মদীনা শরীফের গভর্নরের কাছে চিঠি লিখলেন এবং আদেশ করলেন তিনি যেন মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস শাফেয়ীকে ইমাম মালেক রহ. এর দরবারে নিয়ে যান।

তখনকার যুগে আলেমদের ইজ্জত ও সম্মান রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রেসিডেন্টের চেয়েও বেশি ছিল। মদীনার গভর্নর স্বয়ং ইমাম শাফেয়ী (রহঃ)-কে সাথে নিয়ে ইমাম মালেকের দরবারে উপস্থিত হলেন। অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঢুকে গভর্নর যখন চিঠিখানা দিলেন এবং ইমাম শাফেয়ী রহ. কে তাঁর ছাত্র হিসেবে কবুল করার জন্য সুপারিশ করলেন। ইমাম মালেক (রহঃ) অত্যন্ত জালালতের সাথে বললেন, “ইলমের মর্যাদা কি এতই কমে গেছে যে, এখন ইলম তলবের জন্য চিঠির মাধ্যমে সুপারিশ করা যায়? মক্কার গভর্নর নিজে কেন আসলেন না? আমি এই সুপারিশ কবুল করব না, আমি তাকে পড়াব না।”

গভর্নর যখন দমে গেলেন, তখন তরুণ ইমাম শাফেয়ী নিজে বিনয়ের সাথে সামনে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “হুজুর! আমি কুরাইশ বংশের এক এতিম ছেলে, মক্কা থেকে আপনার কাছে ইলম তলব করতে এসেছি।” কুরাইশ বংশ ও নবীজির বংশের কথা শুনে ইমাম মালেকের অন্তরে নবী-প্রেম জেগে উঠল। (উল্লেখ্য, ইমাম মালেক মদীনাকে এত মহব্বত করতেন যে, ফরয হজ ছাড়া মদীনার বাইরে কোথাও যেতেন না, এই ভয়ে— যেন মদীনার বাইরে তাঁর মৃত্যু না হয়)।

ইমাম মালেক (রহঃ) বললেন, “ঠিক আছে, আমি তোমাকে পড়াব। আগামীকাল থেকে কিতাবের ‘মাতেন’ নিয়ে আসবে।”  ইমাম শাফেয়ী রহ. বললেন হুজুর মাতেন আনা লাগবে মুয়াত্তা আমার পুরা মুখস্ত। তখনকার যুগে কিতাবুল্লাহর পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ কিতাব মনে করা হতো ইমাম মালেকের ‘মুয়াত্তা’কে। ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম সংকলিত কিতাব হলো মুয়াত্তা ইমাম মালেক রহ.।              বলা হতো:

أصحُّ الكتب بعد كتاب الله تعالى: الموطأ للإمام المالك

পরবর্তীতে বুখারী শরীফ তাসনীফ হওয়ার পরে বুখারী শরীফ সম্পর্কে বলা হয়:

اصح الكتب بعد كتاب  الله الصحيح للامام البخاري

এরপর থেকে ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) ইমাম মালেক রহ. ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর দরবারে পড়ে রইলেন। ইলমের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘মুলাযামাতে শেখ’ (ওস্তাদের সার্বক্ষণিক সান্নিধ্যে থাকা)। এই পদ্ধতিতে ইলম অর্জনের বরকত ও মূল্য সবচেয়ে বেশি।

 

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) ও ওস্তাদের সান্নিধ্য

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) ছিলেন ‘মুলাযামাতে শেখ’ বা ওস্তাদের সার্বক্ষণিক সান্নিধ্যে থাকার এক অনন্য ও শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। যেদিন থেকে তিনি মুসলমান হলেন সে দিন থেকে তিনি কখনও রসুল সা. এর দরবার ছেড়ে যান নি।  তিনি মাত্র সাড়ে তিন বছর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রত্যক্ষ সহবত বা সান্নিধ্য পেয়েছিলেন (যেহেতু তিনি ৭ম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ১০ম হিজরীতে নবীজির ওফাত হয়)। অথচ হযরত ওমর ফারুক বা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রাঃ) মতো প্রবীণ ও বড় বড় সাহাবিদের চেয়েও তিনি সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন। এর মূল কারণ ছিল— তিনি ঘর-সংসার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের চিন্তা ছেড়ে সর্বক্ষণ ‘আসহাবে সুফফা’র অন্তর্ভুক্ত হয়ে মসজিদে নববীতে পড়ে থাকতেন এবং আল্লাহর রাসূলের দরবার কখনো ছাড়তেন না।

একবার তিনি নবীজি (সাঃ)-এর কাছে নিজের দুর্বল স্মৃতির কথা আরজ করে বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি যখন আমাদের সামনে কোনো হাদিস বর্ণনা করেন, আমি তা শুনি ঠিকই, কিন্তু পরবর্তীতে আমার সব মনে থাকে না। আপনি আমাকে  এমন একটি দোয়া শিখিয়ে দিন যা পাঠ করলে আমার যেন সব মনে থাকে । নবীজি তখন সরাসরি কিছু বললেন না।

অন্য একদিন মসজিদে নববীতে অন্য কেউ ছিল না, শুধু নবীজি আর আবু হুরায়রা বসা ছিলেন। নবীজি তখন বললেন, “আবু হুরায়রা, তোমার চাদরটি জমিনে বিছিয়ে দাও।” আবু হুরায়রা চাদর বিছালে নবীজি নিজের দুই মোবারক হাত দিয়ে সিনা থেকে কী যেন অঞ্জলি ভরে সেই চাদরের ওপর ঢেলে দিলেন এবং বললেন, “এবার চাদরটি কুড়িয়ে তোমার সিনার সাথে জড়িয়ে নাও।”

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন:

«فَضَمَمْتُهَا فَمَا نَسِيتُ شَيْئًا بَعْدَهُ» (অতঃপর আমি চাদরটি আমার সিনার সাথে জড়িয়ে নিলাম। এর পর থেকে নবীজি যা বলতেন, আমি আর কোনোদিন একটি বর্ণও ভুলিনি। সহীহ বুখারী)

ঠিক ওই সময় দূর থেকে এক সাহাবী এই দৃশ্যটি দেখছিলেন যে, নবীজি (সাঃ) যেন আপন হাত দিয়ে স্পেশাল কিছু হযরত আবু হুরায়রাকে দান করছেন। নবীজির হাত মোবারক গুটিয়ে নেওয়ার পর ওই সাহাবী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলেন এবং আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আবু হুরায়রাকে আপনি স্পেশাল যা দান করলেন, দয়া করে আমাকেও তা কিছু দিন!”

তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে বললেন, “আবু হুরায়রা আমার কাছে আগেই এই দোয়ার দরখাস্ত করে রেখেছিল। আর ঠিক এই মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পেশাল যে নেয়ামত ও নূর আমার অন্তরে এসেছিল, তা আমি আবু হুরায়রাকে দিয়ে দিয়েছি। এখন তো আর তা অবশিষ্ট নেই যে তোমাকে দেব!”

সুবহানাল্লাহ! ওস্তাদের দরবারে সারাক্ষণ পড়ে থাকার এবং সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় উপস্থিত থাকার কী অসামান্য বরকত! যে সময় আল্লাহর রহমত নাযিল হচ্ছিল, আবু হুরায়রা (রাঃ) তখন নবীজির দরবারে হাজির ছিলেন বলেই এই চিরন্তন নেয়ামত লাভ করতে পেরেছিলেন।

ইলমের নূর ও গুনাহ বর্জনের গুরুত্ব

ইলম যেমন অর্জন করতে হবে, তেমনি আমলও করতে হবে এবং গুনাহ বর্জন করতে হবে। ইমাম শাফেয়ী (রহঃ) একবার তাঁর ওস্তাদ ইমাম ওকী (রহঃ)-এর কাছে তাঁর স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার অভিযোগ করলেন। ওস্তাদ তাকে গুনাহ বর্জনের নসীহত করলেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম শাফেয়ী তাঁর বিখ্যাত কবিতায় বলেন:

(আমি ওকী সাহেবের কাছে আমার স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার অভিযোগ করলাম, তিনি আমাকে গুনাহ বর্জনের পরামর্শ দিলেন। এবং আমাকে জানালেন যে, ইলম হলো একটি নূর; আর আল্লাহর নূর কোনো গুনাহগারকে দেওয়া হয় না।)

জান্নাতের ১০০ তলা ও ময়দানে মযীদ

খালেস লিওয়াজহিল্লাহ (একমাত্র আল্লাহর জন্য) ইলম শিখতে হবে। ইলম আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবে। আর সেই ইলম অনুযায়ী আমাদের আমল করতে হবে। আমল হতে হবে একমাত্র আল্লাহর ওয়াস্তে। মানুষ দেখানোর জন্য বা লোক দেখানোর জন্য ইলম-আমল হতে পারবে না, ইখলাস থাকতে হবে। তখন আল্লাহ পাক এই ইলমের দ্বারা আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

﴿يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ﴾ আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন।” (সূরা মুজাদালা: ১১)

যারা মুমিন, আল্লাহ পাক তাদের সম্মানিত করেছেন, তাদের মর্যাদা উচ্চ করেছেন। বিশেষ করে যাদের কাছে ইলম আছে, তাদের সম্মান ও ইজ্জত আরও উঁচু। দুনিয়ার মধ্যেও তাদের সম্মান উঁচু হবে, সবাই তাদেরকে সম্মান করবে। আর আখিরাতে তাদের দরজা (মর্যাদা) বুলন্দ হবে।

মর্যাদা বুলন্দ হওয়ার মানে কী? আল্লাহ তাআলা আলেমদের মর্যাদা আখেরাতে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন। হাদিস শরীফে এসেছে:

«إِنَّ فِي الجَنَّةِ مِائَةَ دَرَجَةٍ، مَا بَيْنَ الدَّرَجَتَيْنِ كَمَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ» (নিশ্চয়ই জান্নাতে একশ’টি স্তর রয়েছে, দুই স্তরের মধ্যবর্তী দূরত্ব আসমান ও জমিনের দূরত্বের সমান। তিরমিযি)

জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত যতটুকু ফাঁকা জায়গা আছে, বেহেশতের এক তলা থেকে অন্য তলার মধ্যবর্তী দূরত্ব ঠিক ততটুকু। বেহেশতের মধ্যে এরকম ১০০টি তলা আছে। তাহলে এটা কত বড় বেহেশত, তা আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। এই ১০০ তলার ওপরে একটি বিশাল মাঠ বা ময়দান আছে, যার নাম ‘ময়দানে মযীদ’। জিব্রাইল (আঃ) বলেছেন, “এই মাঠের হাকিকত কী আমি জানি না, এত বড় মাঠ এটা আমি আয়ত্ত করতে পারি না।” এটা কত বড় মাঠ, একমাত্র আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।

প্রতি জুমাবার জান্নাতবাসীরা সেখানে একত্রিত হবেন। সেখানে আম্বিয়ায়ে কেরামের জন্য রাজকীয় আসন বা চেয়ার বিছানো হবে এবং তাঁদের পেছনে উম্মতরা স্তরে স্তরে বসবেন। বসার ব্যবস্থা এমন চমৎকার হবে যে, একদম শেষ মাথায় বসা ব্যক্তিটিও সামনের নবীকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন।

রিজিকের অমোঘ বিধান ও সন্তান-সন্ততির আধিক্য

এজন্য নবীজী (সাঃ) বলেছেন:

«تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ، فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الْأُمَمَ» (তোমরা এমন নারীকে বিয়ে করো যে স্বামীকে অত্যন্ত মহব্বত করে এবং অধিক সন্তান প্রসব করে। কারণ কেয়ামতের দিন আমি তোমাদের সংখ্যার আধিক্য নিয়ে অন্যান্য উম্মতের সামনে গর্ব করব।)

নবীজী বলেন সন্তান বাড়াতে, অথচ এ যুগে প্রচার করা হচ্ছে সন্তান কমাতে। কেন? রিজিকের ভয়ে; খাবে কোথা থেকে! অনেকে রিজিকের ভয়ে সন্তান জন্মদানে ভয় পায়; কিন্তু মনে রাখবেন, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। ইরশাদ হয়েছে:

وَكُلُّ يَسْتَوْفِي رِزْقَ نَفْسِهِ প্রত্যেক মানুষ তার রিজিক পুরোপুরি পাবে।

হাদিসের মধ্যে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের বলেছেন:”তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত শুক্রবিন্দু হিসেবে জমা থাকে। এরপর পরবর্তী চল্লিশ দিন রক্তপিণ্ড হিসেবে থাকে। এরপর পরবর্তী চল্লিশ দিন মাংসপিণ্ড হিসেবে থাকে। এরপর আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা পাঠান এবং তাকে চারটি বিষয় লিখে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়: তার আমল (ভালো না মন্দ), তার মৃত্যু (সময়কাল), তার রিজিক এবং সে কি সৌভাগ্যবান না দুর্ভাগ্যবান (জান্নাতী না জাহান্নামী) তা লিখে দাও > এরপর তার মধ্যে রুহ (প্রাণ) ফুঁকে দেওয়া হয়…” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৩২০৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৬৪৩)

মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় মানুষের রিজিক লেখা হয়, তাকদীর লেখা হয়। দুনিয়াতে সে ভালো কাজ করবে না খারাপ কাজ করবে, সে জান্নাতী হবে না কি জাহান্নামী হবে, এই মানুষটা দুনিয়ার মধ্যে কতটুকু রিজিক খাবে— সব সেখানে আল্লাহ পাক লিপিবদ্ধ করে দেন। তার জন্য বরাদ্দকৃত যে রিজিক আছে, সেটা তাকে খেতেই হবে। একজন আরেকজনের রিজিক খেতে পারবে না। আর কেউ নিজের রিজিক না খেয়ে মরতেও পারবে না; নিজের রিজিক শেষ করেই তাকে মরতে হবে।

রিজিক নিয়ে একটি চমৎকার শিক্ষণীয় ঘটনা আছে। এক পীর সাহেব তাঁর মুরিদদের নিয়ে সফরে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ক্ষুধা লাগায় তাঁরা এক হোটেলে খেতে বসলেন। পাশে অন্য এক টেবিলে এক ব্যক্তি খাচ্ছিল। পীর সাহেব ওই ব্যক্তির প্লেটের দিকে খুব গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। মুরিদদের খুব লজ্জা লাগছিল যে, পীর সাহেব অন্যের খাবারের দিকে এভাবে লোভীর মতো তাকিয়ে আছেন কেন!

হঠাৎ দেখা গেল, ওই ব্যক্তি যখন একটি লোকমা মুখের কাছে নিল, অমনি একটি ভাতের দানা তার নাকের ভেতরে ঢুকে গেল এবং সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। ডাক্তার এসে অনেক চেষ্টার পর তার নাক থেকে ভাতের দানাটি বের করল। বের করার সাথে সাথেই বাহির থেকে একটি পাখি এসে দানাটি ঠোঁটে করে নিয়ে চলে গেল।

তখন পীর সাহেব মুরিদদের বললেন, “বাবাজিরা, তোমরা ভাবছিলে আমি লোভীর নজরে তাকাচ্ছিলাম এবং তোমাদের লজ্জা লাগছিল। আসলে আমি দেখছিলাম, ওই প্লেটের একটি ভাতের দানার গায়ে লেখা ছিল— এটা এই ব্যক্তির খাদ্য নয়, বরং এটি ‘কুতন’ শহরের একটি পাখির রিজিক। আমি ভাবছিলাম, পাখির রিজিক এই মানুষের প্লেটে আসলো কীভাবে আর মানুষটিই বা তা খায় কীভাবে! কারণ একজনের রিজিক তো অন্যজন খেতে পারে না। আমি এটা গভীরভাবে দেখছিলাম। সে যখন পাখির রিজিক মুখে দিল, তখন সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত দেখলে তো, আল্লাহ দানাটি পাখির ভাগ্যেই পৌঁছে দিলেন।”

আজ মানুষ রিজিকের ভয়ে বার্থ কন্ট্রোল (জন্ম নিয়ন্ত্রণ) করে। অথচ সন্তান-সন্ততি বেশি নেওয়া এটা নবীজির নির্দেশ। তোমরা এমন মেয়েদের বিয়ে করবে যারা বেশি সন্তান জন্ম দেয় এবং স্বামীকে বেশি মহব্বত করে। কারণ যত উম্মত বাড়বে, কেয়ামতের দিন নবী করীম (সাঃ) তা নিয়ে ফখর (গর্ব) করবেন।

জান্নাতেও আলেমদের মুখাপেক্ষীতা এবং আল্লাহর দীদার

যাহোক, ময়দানে মযীদের মধ্যে উম্মতদেরকে নবীদের পেছনে বসানো হবে। পেছনে যে লোকটি বসবে, তিনিও তার নবীকে স্পষ্টভাবে দেখবেন। সেখানে হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের সুমধুর কণ্ঠ (লাহান) দিয়ে কেরাত পড়া হবে। সেখানে জুমুয়াবারে যখন ইজতেমা শুরু হবে এবং সবাই যখন ভরপুর হবে, তখন আল্লাহ পাক গায়েব থেকে আওয়াজ দেবেন: “سَلُونِي عمَا شِئْتُمْ، سَلُونِي عمَا شِئْتُمْ” (তোমাদের যা প্রয়োজন আমার কাছে চাও। তোমাদের মনে যা চায় তা আমার কাছে চাও)।

একথা যখন আল্লাহ পাক বলবেন, মানুষেরা তখন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ভাববে— আমরা বেহেশতে এসেছি, আমাদের তো কোনো নেয়ামতের অভাব নাই। আমরা আল্লাহ পাকের কাছে আর কী চাইব?! আমাদের মনে যা চায়, তা তো আমরা পাচ্ছিই। তারা তখন আলেমদের কাছে ছুটে যাবে এবং বলবে, “আমরা তো এটা বুঝতে পারছি না, আপনারা আমাদেরকে বলে দেন এখন আল্লাহর কাছে কী চাওয়া উচিত।”

দেখুন, দুনিয়াতে যারা আলেমদের থেকে বিমুখ ছিল, তারাও সেখানে আলেমদের মোহতাজ (মুখাপেক্ষী) হবে। দুনিয়াতে মানুষ যেভাবে আলেমদের মোহতাজ, আখেরাতেও ঠিক তেমনি আলেমদের মুহতাজ হবে। জান্নাতেও মানুষ আলেমদের কাছেই পরামর্শ নিতে যাবে।

তখন আলেমরা বলবেন, “তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর ‘দীদার’ বা দর্শন চাও। কারণ জান্নাতের সব নেয়ামত পেলেও আমরা এখনও আল্লাহর চেহারা মোবারক দেখি নি।” তখন সবাই একবাক্যে আল্লাহর দীদার প্রার্থনা করবে। আল্লাহ তাআলা তখন কুদরতি পর্দা উন্মোচন করবেন এবং জান্নাতবাসীরা আল্লাহকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন। হাদিসের ভাষায়:

«إِنَّكُمْ سَتَرَوْنَ رَبَّكُمْ كَمَا تَرَوْنَ القَمَرَ ليلَةَ الْبَدْرِ لَا تُضَامُّونَ فِي رُؤْيَتِهِ» (নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে তেমনই স্পষ্ট দেখবে, যেমন চৌদ্দ তারিখের পূর্ণিমার চাঁদকে দেখতে পাও; তাঁর দর্শনে তোমরা কোনো ভিড়ের বা কষ্টের সম্মুখীন হবে না। বুখারী ও মুসলিম)

বেহেশতের মধ্যে যে ১০০ তলার বিল্ডিং আছে, মানুষ তার নিজের আমলের কারণে হয়তো বেহেশতের প্রথম তলার উপযুক্ত হয় এবং তার প্রথম তলা পর্যন্ত দরজা খোলে। কিন্তু আলেমদের ব্যাপারে আল্লাহ পাক বলছেন যে, তাদের দরজা আরও বুলন্দ করবেন। এর অর্থ হলো, নিজের আমলের কারণে সে যে স্তরের উপযুক্ত হয়েছে, স্পেশাল দ্বীনি ইলম হাসিল করার কারণে আল্লাহ পাক তার মর্যাদা আরও বুলন্দ করবেন এবং তাকে আরও উপরের স্তরে নিয়ে যাবেন। এটাই হলো আলেমদের দরজা বুলন্দ হওয়ার প্রকৃত অর্থ।

ফেরেশতাদের সম্মান ও হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) এর ঘটনা

আমি যে হাদিসটি প্রথমে পাঠ করেছি, সেখানে এসেছে:

وَإِنَّ المَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا لطالب العلم رِضًا بما يطلب (এবং নিশ্চয়ই ফেরেশতারা তালেবে ইলমের (দ্বীনি শিক্ষার্থীর) কাজের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাদের ডানাসমূহ বিছিয়ে দেয়। তিরমিযী)

তালেবে ইলম বা দ্বীনি শিক্ষার্থীরা যে পথ দিয়ে হেঁটে যায়, তাদের সম্মানার্থে ফেরেশতারা নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেয়। যদিও আমরা সাধারণ চোখে তা দেখি না, কিন্তু যাদের অন্তর্দৃষ্টি বা কাশফ আছে তারা দেখতে পান। ফেরেশতারা এভাবেই তালেবে ইলমদের সম্মান করে।

সাহাবি হযরত ইমরান বিন হুসাইন (রাঃ) যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন, ফেরেশতারা তাকে সরাসরি ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে সালাম দিত এবং তিনি তা নিজের কানে শুনতে পেতেন। একবার হঠাৎ ফেরেশতাদের সালাম দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল। তিনি অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে তওবা করতে লাগলেন যে, আমার কোন ত্রুটির কারণে এমন হলো? পরে তিনি বুঝতে পারলেন, একবার অসুস্থতার কারণে তিনি লোহা গরম করে শরীরে দাগ দিয়ে চিকিৎসা (যাকে ‘কাই’ বলা হয়) করিয়েছিলেন। এটি প্রাচীন যুগের এক প্রকার চিকিৎসা ছিল, যা শরীয়তে মকরূহে তানযীহী বা অপছন্দনীয় কাজ। পরবর্তীতে তিনি যখন এ থেকে খাঁটি তওবা করলেন, তখন ফেরেশতারা আবারও তাঁকে সালাম দেওয়া শুরু করে।

মাদরাসার পরিচয় ও সমাপনী নসীহত

সুতরাং, আমি একথা বলতে চাই— আমরা যারা বছরের শুরুতে মাদরাসায় এসেছি, আমাদের উচিত প্রতিদিনের ঘণ্টা বা ক্লাসে ঠিক সময়ে হাজির থাকা এবং মাগরিবের পর ‘তকরার’ ও ‘মোতালা’ (পড়াশোনা ও পুনরাবৃত্তি) করা। বছরের শুরু থেকে যদি আমরা মেহনত করি, তবে সারা বছর আর কষ্ট হবে না। বছরের শুরুতে আমরা যেন ভালোভাবে পড়ালেখা করার খাঁটি নিয়ত করি এবং সেই অনুযায়ী চেষ্টা করি।

আমাদের এই মাদরাসা যেমন ‘دار العلم’ (জ্ঞানের ঘর), তেমনি এটি ‘دار العمل’ (আমলের ঘর)। ইলম অনুযায়ী আমল না থাকলে সেই ইলম কেয়ামতের দিন শাস্তির কারণ হবে। কুরআনের ভাষায় তা হবে— ‘كمثل حمار يحمل اسفارا’ (সেই গাধার মতো, যে কিতাবের বোঝা বহন করে।)

তাই আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে মসজিদে আদায় করব। হুজুররা যেভাবে আমাদের নেগরানি (তত্ত্বাবধান) করেন, আমরা সেভাবে চলব। আমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চুল-দাড়ি, চালচলন সবকিছু যেন হুবহু সুন্নতের মোতাবেক হয়। গুনাহ থেকে নিজের কলবকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে; কারণ গুনাহ করলে কলব কালো হয়ে যায় এবং ইলমের নূর চলে যায়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহ নিয়তে ইলমে দ্বীন অর্জন করার এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

 

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print