মাওলানা সলিম উদ্দীন মাহদী কাসেমী

আজ ১৩ জুলাই ২০২৬, সোমবার, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার মুহতামিম মুফতি একরাম হোসেন ওদুদী হাফিযাহুল্লাহ-এর সার্বিক নির্দেশনা, নেতৃত্ব ও বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে জামিয়ার একটি ত্রাণ কাফেলা চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত বিভিন্ন উপজেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। যাত্রার পূর্বে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করেন। এ সময় তিনি এই মানবিক খিদমত কবুল হওয়া, দুর্গত মানুষের কষ্ট লাঘব এবং এ কাজে সম্পৃক্ত সবার কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করেন।
ত্রাণ কাফেলায় উপস্থিত ছিলেন জামিয়ার নায়েবে মুহতামিম আল্লামা জাকারিয়া আজহারী, মাওলানা হাফেজ মাসুম, মুফতি মনসুর সিদ্দিক, সলিমুদ্দিন মাহদী কাসেমী, আনিসুল হক, মাওলানা নাসির উদ্দিন, মাওলানা ত্বকী, মাওলানা সুহাইল কাসেমীসহ জামিয়ার একদল নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবক। তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল বন্যাদুর্গত মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়া এই অভয়বাণী—”আপনারা একা নন, আপনাদের পাশে রয়েছে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া।”
বাঁশখালী: ঘরে ঘরে মানবতার স্পর্শ
ত্রাণ কাফেলা প্রথমে বাঁশখালী উপজেলার ছাপাছড়ি, ইলশা, হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. মাদ্রাসা, ইউনুসিয়া মাদীনাতুল উলূম মাদরাসাসহ একাধিক বন্যাকবলিত এলাকায় পৌঁছায়। কাফেলার সদস্যরা কোথাও ঘরে ঘরে গিয়ে, আবার কোথাও মাদরাসাকে কেন্দ্র করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ও উপহার তুলে দেন।
এই কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়নে আন্তরিক সহযোগিতা করেন মাদ্রাসা আবু বক্কর সিদ্দিক এর মুহতামিম মাওলানা ইউসুফ সাঈদ, ইউনুছিয়া মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা আব্দুর রহমান নোমানসহ সংশ্লিষ্ট মাদরাসাগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম।
সাতকানিয়া: দুর্গম জনপদে মানবিক অভিযাত্রা
এরপর ত্রাণ কাফেলা সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া টেক সংলগ্ন বুধপাড়া, কেওছিয়া ওবাইদিয়া মাদরাসা, নলুয়া, ডলুকুল, ভিল্লাপাড়া, জনার কেউসিয়াসহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করে।
এই কার্যক্রমে জামিয়ার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা নাসির উদ্দিন সাহেব সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন। সহযোগিতায় ছিলেন হাতিয়ারকুল কাসেমিয়া নুরুল মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি মনসুর সিদ্দিকী, জামিয়ার সাবেক প্রফেসর রাসেল সাহেব, মাওলানা লোকমান হাকিম, জনার কেউচিয়া ওবাইদিয়া মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা ইদ্রিস সাহেবসহ স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম এবং অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক। বিশেষ করে মাওলানা ত্বকী ও মাওলানা সুহাইল কাসেমী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম প্রান্তিক এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

ডিঙ্গি নৌকায় মৃত্যুঝুঁকি পেরিয়ে
ডলুকুল ও ভিল্লাপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় যোগাযোগের কোনো সড়কপথ অবশিষ্ট ছিল না। কোথাও কোমরসমান পানি, কোথাও বিস্তীর্ণ জনপদ নদী রূপ নিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে ডিঙ্গি নৌকায় করে উত্তাল স্রোত পেরিয়ে দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়েছে।
নৌকা ঘাটে ভিড়তেই দেখা যায় এক আবেগঘন দৃশ্য। শিশুদের উচ্ছ্বাস, বৃদ্ধদের ব্যাকুল অপেক্ষা আর অসহায় মায়েদের অশ্রুসজল চোখ যেন বলে দিচ্ছিল—মানবতা আজও বেঁচে আছে।
যে দৃশ্যগুলো হৃদয়কে কাঁদিয়েছে
আজকের সফরের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল বেদনাবিধুর ও শিক্ষণীয়:
* *নিমজ্জিত মাদরাসা ও আত্মত্যাগ:* মাদরাসা আবু বকর সিদ্দিক এখনও কোমরসমান পানিতে নিমজ্জিত। যে আঙিনায় প্রতিদিন কুরআনের তিলাওয়াত ধ্বনিত হতো, আজ সেখানে শুধু পানির ঢেউ। তবুও সেই মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিজেদের কষ্ট ভুলে অন্যের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন।
* *অসহায়ত্বের চিত্র:* একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধ লাঠি হাতে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে ত্রাণ নিতে এসেছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাই-বোনেরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছেন সামান্য খাদ্যের আশায়। শিশুদের ক্ষুধার্ত চোখ আর বৃদ্ধ মায়েদের নীরব কান্না উপস্থিত সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
* *সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত:* মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে ত্রাণ গ্রহণ করেছেন। মাদরাসার আলেমরা নিজ হাতে অমুসলিম ভাই-বোনদের কাছে ত্রাণসামগ্রী তুলে দিয়েছেন। এই দৃশ্য নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলামের শিক্ষা বিভাজনের নয়, বরং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর।
জামিয়া পটিয়ার ঐতিহ্য: ইলম ও মানবতার বাতিঘর
আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার ইতিহাস কেবল ইলম ও দীনের খিদমতের নয়, বরং মানবতার সেবারও এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়, দেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যা এবং জাতীয় সংকটের প্রতিটি মুহূর্তে জামিয়া সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই ত্রাণ কার্যক্রমও সেই ঐতিহ্যেরই একটি ধারাবাহিকতা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
> “যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না।”
এই নববী আদর্শকে বুকে ধারণ করে জামিয়া পটিয়া বিশ্বাস করে, মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ইবাদতেরই একটি মহান অংশ।
সবার প্রতি আকুল আহ্বান
আমরা দেশ-বিদেশের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী, দাতা এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিসহ মানবিক হৃদয়ের সব মানুষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই—আপনারাও বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান। আপনার সামান্য সহযোগিতা হয়তো একটি ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে পারে, একটি পরিবারের বেঁচে থাকার নতুন আশা জাগাতে পারে।
মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়াকে দীনের খিদমতের পাশাপাশি মানবতার সেবায় নিয়োজিত থাকার তাওফীক দান করেন। এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী এবং সহযোগিতাকারী সবার খিদমত কবুল করুন। বন্যাকবলিত মানুষের কষ্ট দ্রুত দূর করে তাদের ওপর অশেষ রহমত ও নিরাপত্তা নাযিল করুন।
*আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।*

