স্মৃতিতে মুফতি আহমদ উল্লাহ

গাজি সানা উল্লাহ রাহমানি
জামিয়া পটিয়ায় ঢুকলাম। বছর চারেক আগের কথা। ‌ আশপাশে কোথাও মাহফিল। যে কোন মাহফিলের ক্ষেত্রে আমি বিশ্রাম এবং দ্বিলি প্রশান্তির জন্য আশপাশের‌ কোন‌ মাদ্রাসাকে বেছে নেই। ‌ আর পটিয়া- সে তো মানারাতুল ইলম।‌ মাগরিবের পরে হযরতুল আল্লাম মাওলানা আহমাদুল্লাহ হাফিযাহুল্লাহ’র সাথে দেখা করার ব্যবস্থা হল। হযরতের আকরাব কয়েকজন অনুজ ছাত্র আমাকে দেখা করার ব্যবস্থা করলেন। ফরজ পড়ে বসে আছি, ‌ হযরত নফল নামা‌জে নিমগ্ন। ‌বেশ খানিকটা পরে দুজন ছাত্রের হাতে‌ কিছুটা ভর করে তিনি মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসলেন। ‌
আমি সালাম দিয়ে এগিয়ে গেলাম। মুসাফাহার জন্য হাত বাড়ালাম। আমার সাথে থাকা পটিয়ার ছাত্ররা হযরতকে আমার পরিচয় দিলেন। আমি অত্যন্ত ভক্তি- শ্রদ্ধা এবং আগ্রহ নিয়ে বাংলাদেশে হাদীস শাস্ত্রের চর্চা ও বিকাশের এই প্রাণপুরুষের হাত দুটোকে স্পর্শ করলাম।‌ পাহাড় সম মানুষ ছিলেন তিনি, ইলমের দিক থেকে এবং ব্যক্তিত্বের দিক থেকেও। কিন্তু আচরণে ছিলেন অমলিন। ‌ খোলা আকাশের মতো উদার। তিনি যেখানে ইলমের পর্বতশৃঙ্গ আমি সেখানে নাচিজ, লা-শাঈ। তবুও তিনি দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত আমার সাথে কথা বললেন দাঁড়িয়ে থেকে। গল্পের ঝুলি মেলে ধরলেন যেন। তার অতীতের কথা, তার সোনালী শৈশবের কথা। করাচিতে তার আলো ঝলমলে দিনগুলোর কথা। তিনি বলছেন এবং তার কথার ফুলঝুড়ির দীপ্তি তার চেহারায় প্রকাশ পাচ্ছে। ‌
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমনটি করে সাহাবীদের সাথে কথা বলার সময় তাদের হাত ধরে রাখতেন, নবীজির হাদিসের ব্যাখ্যাকারী এই মানুষটিও সেই অমলিন সুন্নাহ অনুযায়ী আমার হাত রেখে ধরে রাখলেন, অনেকক্ষণ, দীর্ঘক্ষণ। আমার মনে হচ্ছিল, এ সময় কাটতে থাকুক, এই সময় যেন কখনো না ফুরায়, এই আলোকজ্জ্বল মুহূর্ত, এই মাহেন্দ্রক্ষণ, এই জ্যোতির্ময় সময় জীবনে খুব একটা পাওয়া যাবে না।
আমি অবাক হয়ে, আপ্লুত হৃদয়ে তাকে দেখলাম, হৃদয়ের শ্রদ্ধা সরোবরে থাকে ধারণ করলাম। তিনি বলে গেলেন একনাগারে‌, তার কৈশোরকালীন উৎসব সময়ের কথা, ইলম আহরণে ছুটে চলার কথা, উড়ে বেড়ানোর কথা, তার কথার উচ্ছ্বাস, কণ্ঠের উচ্চারণ এবং তার চেহারা দীপ্তি আমি আজও ভুলিনি, হৃদয়ের মানষপটে ধরে রেখেছি সেই স্মৃতি সোনালী ফ্রেমে…।‌
বিগত কয়েক মাস ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। হাসপাতালে শয্যাশায়ী ছিলেন, আইসিওতে ছিলেন।‌ সারা দেশের আলেম-ওলামারা তার সুস্থতার জন্য দোয়া করেছেন। আমরা ভেবেছিলাম, তিনি আবারো সুস্থ হয়ে ফিরে যাবেন তার প্রিয় প্রাঙ্গণ পটিয়াতে। কিন্তু না, সেটি হল না। ‌ ‌আজ সেই ইলমের প্রখর ও উদ্দীপ্ত সুর্য অস্তমিত হলো। তিনি পাড়ি জমালেন আখেরাতের পথে, তার প্রিয় রবের সকাশে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
জামিয়া পটিয়ার অনন্য দিকপাল, বাংলাদেশে ইলম এবং আমলের জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্ব, হযরতুল আল্লামা শাইখুল হাদিস আল্লামা আহমাদুল্লাহ সাহেবের জান্নাতে উচ্চ মাকাম প্রত্যাশা করছি আল্লাহর কাছে,
আজ সকাল থেকে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। নাগরিক টেলিভিশনের সেটে বসেই পেয়েছি হযরত ইন্তেকালের শোক সংবাদ।‌ সারা দেশ থেকে তার ছাত্ররা, তার শিক্ষার্থীরা, তার ভক্তরা ছুটছেন পটিয়ার উদ্দেশ্যে, তাদের চোখ থেকেও আজ অশ্রু ঝরে পড়ছে। ‌ আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টি ধারা ‌ এবং শোকাহত মানুষের অশ্রু আজ মিলেমিশে একাকার।
রাত সাড়ে নয়টায় জানাজার মাধ্যমে হযরতকে শেষ বিদায় জানানো হবে। রহমতের বারিধারায় শিক্ত হয়ে উঠুক হযরত কবর, জান্নাতের উচ্চ মাকামে সমাসীন হন তিনি, বিনীত কণ্ঠে শোকাহত হৃদয়ে আল্লাহ পাকের কাছে এই কামনা করছি, যিনি আমাদের হায়াত এবং মউতের একমাত্র মালিক।
Facebook
Twitter
LinkedIn
Skype
WhatsApp
Email
Print

নোটিশ