ইসলামী দল হওয়ার মানদন্ড

গত ১ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বৃহস্পতিবার, বাদ ফজর আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার জামে মসজিদে জামিয়ার সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বয়ান পেশ করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসিরে কুরআন, তরজুমানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত এবং মুনাজিরে জামান হযরত আল্লামা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী হাফিজাহুল্লাহ।

বর্তমান ফিতনাপূর্ণ সময়ে নানামুখী বিভ্রান্তি ও মতাদর্শিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি মওদুদীবাদী ফিতনাও উম্মতের মাঝে যেভাবে বিস্তার লাভ করছে এবং বিশেষত কওমি অঙ্গনে যার বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এ প্রেক্ষাপটে হযরতের দালিলিক ও বিশ্লেষণধর্মী বয়ানটি এ ফিতনা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, এর প্রকৃতি অনুধাবন এবং তা মোকাবিলায় যথাযথ দিকনির্দেশনা প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সময়োপযোগী, ফলপ্রসূ ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

হযরতের মূল্যবান বয়ানটি বিষয়ের গুরুত্ব, দলিল-প্রমাণ ও সময়ের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় সকলের উপকারের উদ্দেশ্যে এখানে উপস্থাপন করা হলো।  -আকরাম সা’দী

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين

أَمَّا بَعْدُ. فَأَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ. بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ »الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا«

হযরাত আসাতিযায়ে কেরাম এবং আমার প্রিয় ছাত্র ভাইয়েরা!
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মায়িদার ৩ নম্বর আয়াতের সামান্য অংশ আমি আপনাদের সামনে তিলাওয়াত করেছি। তাতে আল্লাহ তাআলা বলেন  الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ» — অর্থাৎ আজকে তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপুর্ণ করে  দিয়েছি।

এখানে তিনটি কথা ব্যাখ্যাসাপেক্ষে বুঝতে হবে। একটি হলো—‘আজ’ বলতে আল্লাহ কোন দিন বুঝালেন?
 দ্বিতীয়টি হলো—‘আমাদের দ্বীন’ বলতে আল্লাহ কী বুঝালেন?
তৃতীয়টি হলো—‘পরিপূর্ণ’ বলতে কী বুঝালেন?
‘পরিপূর্ণ’ কথাটি ব্যাখ্যাসাপেক্ষে বোঝার বিষয়।
‘দ্বীন’ কথাটিও ব্যাখ্যাসাপেক্ষে বোঝার বিষয়।
আর ‘আজ’—এই শব্দটিও ব্যাখ্যাসাপেক্ষে বোঝার বিষয়।

আমি প্রথম কথা—‘আজ’ থেকে আলোচনা শুরু করছি। আল্লাহ তাওফিক দিলে যতটুকু বলা যায়, সব কথা হয়তো একদিনে শেষ করা সম্ভব হবে না। তারপরও আল্লাহ যদি বলার তাওফিক দেন, আমি বলার চেষ্টা করব। আপনারা একটু মনোযোগ দিয়ে শুনবেন এবং বোঝার চেষ্টা করবেন। আর আমাকে আপনাদের বোঝার মতো করে বলার তাওফিক যেন আল্লাহ দান করেন—এই দোয়া করবেন।

বিদায় হজ ও আয়াতের নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট

আয়াতটি নাযিল হয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বিদায় হজকে কেন্দ্র করে। রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনের শেষ হজ পালন করেন। সেই হজ পালনের প্রায় তিন মাস পর তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। এ কারণে তাঁর এই হজ ইসলামের ইতিহাসে বিদায় হজ নামে পরিচিত।

হজের তিন ফরজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ হলো জিলহজ মাসের ৯ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। হজের পরিভাষায় এটিকে ‘উকুফে আরাফা’ বলা হয়। রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিদায় হজে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ শুক্রবার আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন এবং তাঁর সঙ্গে লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামও সেখানে অংশগ্রহণ করেন।

আরাফার ময়দানের এক প্রান্তে একটি পাহাড় রয়েছে, যা জাবালে রহমত নামে পরিচিত। এই পাহাড়ের পাদদেশে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বাহনের পিঠে আরোহিত অবস্থায় হজে অংশগ্রহণকারী লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে একটি ঐতিহাসিক ও মহামূল্যবান ভাষণ প্রদান করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই ভাষণ বিদায় হজের ভাষণ নামে প্রসিদ্ধ।

এই ঐতিহাসিক ভাষণের প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তাআলা সূরা আল-মায়িদার ৩ নম্বর আয়াত নাজিল করেন, যাতে ঘোষণা করা হয়েছে—আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।

এই ভাষণের শেষের দিকে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমবেত লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—আমি কি আল্লাহর নাজিলকৃত সব কথা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি?
সাহাবায়ে কেরাম সাক্ষ্য দিলেন—হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহকে সাক্ষী করে বললেন—হে আল্লাহ! আপনি সাক্ষী থাকুন। আপনার নাজিলকৃত সকল কথা আমি আপনার বান্দাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।

এরপর আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন আয়াত নাজিল করে বলেন—«الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ» অর্থাৎ, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।

এখানে তিনটি কথা লক্ষ্য করার বিষয়।

এক. আল্লাহর নাজিল করা সব কথা রাসূল আল্লাহর বান্দাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন—এমন দাবি করেছেন।
দুই.  সেই দাবির পক্ষে লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরাম সাক্ষ্য দিয়েছেন।
তিন. আল্লাহ তাআলা সেই দাবি ও সাক্ষ্যকে সত্যায়ন করে আল্লাহ পাক বলেছেন—«الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ» আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।

যদি রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাবি—নাউযুবিল্লাহ—মিথ্যা হতো; অর্থাৎ তিনি কিছু কথা পৌঁছানো বাকি রেখেই দাবি করতেন, ‘আমি সব কথা পৌঁছে দিয়েছি’, আর সাহাবায়ে কেরামও তাঁর দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দিতেন, তাহলে রাসূলের দাবি মিথ্যা হতো এবং সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্যও মিথ্যা হতো।

এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলার পক্ষে এ কথা ঘোষণা করা সম্ভব হতো না যে—«الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ»  ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।’

আল্লাহ তাআলা রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ দাবি ও সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্যকে প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং তা সত্যায়ন করে ঘোষণা করেছেন—«الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ»   অর্থাৎ, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।’ সুতরাং রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাবি সত্য ছিল এবং সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্যও সত্য ছিল। তিনি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরামও তাঁর পৌঁছে দেওয়ার সাক্ষ্য সত্যভাবেই প্রদান করেছেন।

রাসূলের রিসালাতের দায়িত্ব

এখানে আরেকটি বিষয় বোঝা দরকার। এত সতর্কতার সাথে  রাসুল দাবি করলেন আর  সাহাবায়ে কিরাম সে দাবির পক্ষে সাক্ষী দিলেন। তার পর আল্লাহর রাসুল আল্লাহকে সাক্ষী করলেন। এত সতর্কতার সাথে বিষয়টি সম্পাদন করার কারণ হল: ইতিপূর্বে আল্লাহর রাসূলের কাছে একটি আয়াত নাজিল করে আল্লাহ বলেছিলেন— ﴿يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ ۚ  হে রাসূল! আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা কিছু নাজিল করা হয়েছে, তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিন। যদি আপনি তা না করেন, তাহলে আপনার রিসালাতের দায়িত্ব পালন করা হবে না।
এখান থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল—রিসালাতের দায়িত্ব হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত সত্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। রিসালাতের দায়িত্ব অসম্পূর্ণ থাকা অত্যন্ত মারাত্মক বিষয়। আল্লাহ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন—সব কথা পৌঁছে না দিলে রিসালাতের দায়িত্ব সম্পন্ন হবে না।

তাই বিদায় হজের দিনে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নাজিলকৃত সত্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দাবি করেছেন, সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে সাক্ষ্য নিয়েছেন এবং আল্লাহকে সাক্ষী করেছেন।

এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর দাবি ও সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্যকে সত্যায়ন করে বলেছেন—আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।

একটি ভ্রান্ত মতবাদের প্রসঙ্গ

এতটুকু কথা বোঝার পরে একটি ভ্রান্ত মতবাদের কথা পরিষ্কারভাবে আমাদের বুঝে নেওয়া দরকার।
আমাদের উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের ভ্রান্ত মতবাদ উদ্ভাবন করেছেন এবং মুসলমানদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন হলেন সৈয়দ আবুল আ‘লা মওদূদী।

সৈয়দ আবুল আ’লা মওদূদীর লিখিত কোরআনের ব্যাখ্যাগ্রন্থের নাম তাফহীমুল কোরআন।

তাঁর দলের নেতাকর্মী ও সদস্যদের জন্য একটি পাঠ্যতালিকা রয়েছে। তাঁদের দল অত্যন্ত সুসংগঠিত। পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মুসলমানদের প্রথমে সমর্থক, তারপর সদস্য এবং ধীরে ধীরে নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

এই প্রক্রিয়ায় যারা তাঁদের দলে দীক্ষিত হয়, তাদের পাঠ্যতালিকায় মওদূদী সাহেবের বিভিন্ন বই পড়ানো হয়। সেই তালিকার অন্যতম বই হলো তাফহীমুল কোরআন। তাঁদের দলের নেতাকর্মীদের কাছে এই গ্রন্থ কোরআনের তাফসির হিসেবে পরিচিত।

এখন প্রশ্ন হলো—তাফহীমুল কোরআন কি সত্যিই তাফসির, নাকি এতে মনগড়া ব্যাখ্যা রয়েছে?

এই বিষয়টি আগে দলিলসহ বুঝে নেওয়া দরকার।

তিনি তাঁর তাফহীমুল কোরআনের ভূমিকায় লিখেছেন—এই তাফহীমুল কোরআন লিখতে গিয়ে তিনি পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের অনুকরণ করেননি এবং পরবর্তী মুফাসসিরদেরও অনুসরণ করেননি; বরং তিনি নিজে নিজে কোরআন পড়ে মনে মনে যা বুঝেছেন, তা-ই লিখেছেন। অর্থাৎ তিনি কারো কাছ থেকে কোরআনের তাফসির শেখেননি; নিজে নিজে কোরআন পড়ে যা বুঝেছেন, তাই লিখেছেন।

মনগড়া তাফসিরের পাঁচ প্রকার
এখন আমাদের বুঝতে হবে—মনগড়া তাফসির কাকে বলে?

আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আল-ইতকান ফি উলূমিল কোরআন গ্রন্থে কোরআনের মনগড়া তাফসিরের পাঁচটি প্রকার উল্লেখ করেছেন।আমাদের ছাত্র ভাইদের ভালোভাবে মনে রাখা দরকার—মনগড়া তাফসির পাঁচ প্রকার।
প্রথমত: তাফসির করার যোগ্যতা অর্জন না করে তাফসির করা।

তাফসিরের যোগ্যতা কী?

সংক্ষেপে বলতে চাই, যারা কোরআনের তাফসির করার যোগ্যতা রাখেন, তাঁরা তিন স্তরে বিভক্ত। প্রথম স্তরের মুফাসসিরীনে কেরাম মুজতাহিদে মুতলাক হয়ে থাকেন।

দ্বিতীয় স্তরের মুফাসসিরীনে কেরাম মুজতাহিদ হলেও মুজতাহিদে মুতলাক নন; তাঁরা মুজতাহিদে মুকাইয়্যাদ বা মুজতাহিদে মাজহাব হয়ে থাকেন।

তৃতীয় স্তরের মুফাসসিরদের জন্য মুজতাহিদ হওয়া শর্ত নয়। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের মুফাসসিরগণের লিখিত তাফসির বোঝার সক্ষমতা তাঁদের থাকতে হবে।

যিনি কোরআনের তাফসির করবেন, তিনি যদি প্রথম শ্রেণির মুফাসসিরগণ কোনো আয়াতের তাফসির কীভাবে করেছেন তা না জানেন বা না বোঝেন, তাহলে তাঁর তাফসির করার যোগ্যতা নেই।

একইভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির মুফাসসিরগণ কোনো আয়াতের তাফসির কীভাবে করেছেন, তা যদি তিনি না জানেন বা না বোঝেন, তাহলেও তিনি তৃতীয় শ্রেণির মুফাসসির হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না।

সুতরাং যার তাফসির করার যোগ্যতা নেই, সে যদি কোরআনের তাফসির করে, আল্লামা সুয়ূতির বর্ণনা অনুযায়ী সেটি মনগড়া তাফসিরের প্রথম প্রকার।
দ্বিতীয়ত: যোগ্যতা থাকার পরও যদি তাফসিরের মূলনীতি বা উসুলের খেলাফ তাফসির করা হয়, তাহলে সেটি দ্বিতীয় প্রকার মনগড়া তাফসির।
তৃতীয়ত: হুরূফে মুকাত্তাআত ও আয়াতে মুতাশাবিহাতের ব্যাপারে অনিশ্চিত বিষয়কে নিশ্চিত অর্থে বর্ণনা করা।
চতুর্থত: নিজের মতবাদ আগে মনগড়াভাবে প্রতিষ্ঠা করে পরে কোরআনের তাফসিরের আশ্রয় নিয়ে নিজের মতবাদকে প্রমাণ করা।
পঞ্চমত: কোনো উস্তাদের কাছে তাফসির না শিখে নিজে নিজে তাফসির করা।

আমার ছাত্র ভাইয়েরা, এই পঞ্চম বিষয়টি ভালোভাবে মনে রাখবেন।
পঞ্চম প্রকার মনগড়া তাফসির হলো—কোনো ওস্তাদের কাছে তাফসির না শিখে নিজে নিজেই তাফসির করা।

আর মওদূদী সাহেব তাঁর তাফহীমুল কোরআনের ভূমিকায় লিখেছেন—তিনি পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের কাছ থেকে তাফসির গ্রহণ করেননি, পরবর্তী মুফাসসিরদের কাছ থেকেও তাফসির গ্রহণ করেননি; বরং নিজে নিজে কোরআন পড়ে যা বুঝেছেন, হুবহু তা লিখে দিয়েছেন।

আমি আমার ছাত্র ভাইদের কাছে জিজ্ঞাসা করব—এটা কত নম্বর মনগড়া তাফসির?

পঞ্চম নম্বর মনগড়া তাফসির। তিনি নিজেই তাঁর তাফহীমুল কোরআনের ভূমিকায় বিষয়টি পরিষ্কারভাবে লিখে রেখে গেছেন।

পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মুফাসসিরগণ
আরও কিছু আনুষঙ্গিক কথা আমাদের বুঝে নেওয়া দরকার। সেটি হলো—পূর্ববর্তী মুফাসসিরীনে কেরাম কারা এবং পরবর্তী মুফাসসিরীনে কেরাম কারা?

যাঁদের কারও কাছ থেকে মওদূদী সাহেব তাফসির শেখেননি, তাঁদের মধ্যে পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের প্রথম পর্যায়ে রয়েছেন স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
দ্বিতীয় স্তরে রয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
তৃতীয় স্তরে রয়েছেন তাবেঈন।
চতুর্থ স্তরে রয়েছেন তাবে-তাবেঈন।
পঞ্চম স্তরে রয়েছেন আইম্মায়ে মুজতাহিদীন।
আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের পরে যারা কোরআনের তাফসির করেছেন, তাঁরা পরবর্তী মুফাসসিরীনে কেরাম।

কিন্তু তিনি পরবর্তীদের কাছ থেকেও তাফসির গ্রহণ করেননি। আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের কাছ থেকেও নয়, তাবে-তাবেঈনের কাছ থেকেও নয়, তাবেঈনের কাছ থেকেও নয়, সাহাবায়ে কেরাম থেকেও নয়।

এমনকি মওদূদী সাহেব কোরআনের ব্যাখ্যা স্বয়ং মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকেও গ্রহণ করেননি; তিনি নিজে নিজেই তাফসির করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরআন কীভাবে শিখেছেন?

এবার আমরা একটু অগ্রসর হয়ে দেখব—মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোরআনের তাফসির কোথা থেকে শিখেছেন?
যে নবীর কাছে কোরআন নাজিল হয়েছে, তিনি কোরআনের ব্যাখ্যা কোথা থেকে শিখেছেন?

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে বলেছেন—«إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ ۝ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ۝ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ» অর্থাৎ, কোরআন সংরক্ষণ, পাঠ এবং তার ব্যাখ্যা আল্লাহর দায়িত্ব।

এখান থেকে পরিষ্কার হয়—রাসূল নিজে নিজে কোরআন শিখেননি; আল্লাহর কাছ থেকে কোরআন শিখেছেন। রাসূল নিজে নিজে কোরআনের অর্থ বুঝেননি; আল্লাহ তাঁকে কোরআন বুঝিয়েছেন।

যেখানে যে নবীর কাছে কোরআন নাজিল হয়েছে, তাকেও আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেখানে মওদূদী সাহেব কারও কাছ থেকে কোরআন শেখেননি—তিনি নিজে নিজেই বুঝেছেন।

আমি আশা করি, আমার ছাত্র ভাইয়েরা আমার কথাগুলো বুঝেছেন।
তাহলে আপনারা স্বয়ং বিচার করুন—তাফহীমুল কোরআন কি সত্যিই তাফসিরুল কোরআন, নাকি নিজের মনগড়া ব্যাখ্যার সমষ্টি?

নবীগণ কি গুনাহগার?

এবার আমরা বোঝার চেষ্টা করব, কোরআনের ব্যাখ্যায় প্রবৃত্তির অনুসরণ কীভাবে করা হয়েছে।
মওদূদী সাহেবের বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদের মধ্যে একটি মতবাদ হলো—সমস্ত নবী-রাসূল গুনাহগার।
তাঁর বিভিন্ন লিটারেচারে এ ধরনের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমস্ত নবী গুনাহ করেছেন।
এই মতবাদ যাচাই করার জন্য আমাদের আগে বুঝতে হবে—নবীগণের গুনাহ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন।

হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহর কাছে তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে নবী বানানোর কথা বলেছিলেন, তখন আল্লাহ তাআলা বলেছেন— «لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ» অর্থাৎ, আমার অঙ্গীকার জালিমদের কাছে পৌঁছাবে না। এখানে আল্লাহর একটি মূলনীতি পরিষ্কার হয়ে যায়।

আল্লাহ যাঁদের নবী বানান, তাঁদের জন্য বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। নবুয়তের দায়িত্বের সঙ্গে পাপাচারকে একাকার করা যায় না। এখন যদি বলা হয়—হযরত আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে গুনাহ করেছিলেন, তাহলে প্রশ্ন হলো—কে লিখেছেন? কোথায় লিখেছেন?

মওদূদী সাহেব তাফহীমুল কোরআনে হযরত আদম আলাইহিস সালামকে এভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করেছেন।
এই মতবাদ গ্রহণ করলে আল্লাহর মূলনীতি বহাল থাকে কি?
যে ব্যাখ্যার দ্বারা আল্লাহর নির্ধারিত মূলনীতি লঙ্ঘিত হয়, সেটি কি সঠিক ব্যাখ্যা হতে পারে?
সুতরাং আল্লাহর এই মূলনীতির আলোকে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।

মওদূদী ও খ্রিস্টান মতবাদের তুলনা

বর্তমান সমাজে মুসলমানদের—বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-উস্তাদদের—এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার।
কারণ বর্তমান প্রেক্ষাপটে কওমি ওলামাদের অঙ্গনে বিভিন্ন মতবাদের অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টা হচ্ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।
কিছু কওমি আলেম ও ছাত্র মওদূদী মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন—এমন কথাও বলা হয়।
তাঁদের বক্তব্য হলো, তাঁরা ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাঁরা ‘ইকামতে দ্বীন’-এর কথা বলেন।

আমি প্রশ্ন করি—নবীগণকে গুনাহগার সাব্যস্ত করার মতবাদ ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কোন কাজে লাগে?
ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে হলে নবীকে গুনাহগার বানাতে হবে কেন?

নবী গুনাহগার না হলে কি ইসলামী হুকুমত কায়েম হয় না?
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি মদিনায় ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেননি?
তিনি কোন নবীকে গুনাহগার বলে গেছেন?
ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে নবীদের গুনাহগার সাব্যস্ত করার সম্পর্ক কোথায়?

এখন আরেকটি বিষয় দেখুন।
কাদিয়ানিরা নিজেদের দলের নাম দিয়েছে আহমদিয়া মুসলিম জামাত। ‘মুসলিম জামাত’ অর্থ কী? মুসলমানের দল।
তাই বলে কি কোনো মুসলমান কাদিয়ানিদের মুসলমানের দল বলতে পারে?

যেমন কাদিয়ানিরা নিজেদের মুসলমানের দল বললেও মুসলমানেরা তাদের সেই দাবি গ্রহণ করে না, তেমনি কোনো দল নিজেদের ইসলামী দল বললেই তাদের ইসলামী দল হিসেবে গ্রহণ করতে হবে—এমন নয়।

এজন্য আমি তাদের নিজেদের দেওয়া নাম ব্যবহার না করে মওদূদীবাদী বা মওদূদী মতাবলম্বী বলে উল্লেখ করছি।

হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও নিষিদ্ধ গাছের ঘটনা

এখন আমরা বুঝার চেষ্টা করব—হযরত আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে কতটুকু গুনাহ করেছিলেন?

এর আগে আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই—একটি দেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নবীকে গুনাহগার সাব্যস্ত করা কি দরকার? আর স্বয়ং নবী যদি গুনাহগার হয়ে থাকেন, তাহলে তোমরা যারা নবীর উম্মত, তোমরা নবীর চেয়ে বড় নও।

ইসলামী শাসনব্যবস্থার স্লোগান তুলে সর্বস্তরের মুসলমানকে যদি কোনো ভ্রান্ত মতবাদে প্রভাবিত করা হয়, তাহলে সেই মতবাদের ভিত্তি আমাদের যাচাই করতে হবে।

এখন আমরা মূল প্রশ্নে ফিরে আসি।

মওদূদী ও খ্রিস্টানদের দাবিও একই—প্রথম নবী আদম আলাইহিস সালাম প্রথম গুনাহগার। তাঁদের উভয়ের দলিলও একই—জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার ঘটনা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে মুসলমানদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তাদের পক্ষ থেকে বাংলায় বিভিন্ন বই-পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে।

এর মধ্যে একটি বইয়ের নাম—কোরআনের আলোকে বেহেশতে যাওয়ার পথ।
সাধারণ মুসলমান তো দূরের কথা, কোনো মাদ্রাসার ছাত্রও শুধু বইয়ের নাম দেখে বুঝতে পারবে না যে এটি খ্রিস্টানদের লেখা। সেই বইয়ে খ্রিস্টান লেখকরা যে মতবাদ উপস্থাপন করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো—প্রথম নবী আদম আলাইহিস সালাম প্রথম গুনাহগার।

খ্রিস্টানরাও বলে—প্রথম নবী আদম প্রথম গুনাহগার।
মওদূদী সাহেবও বলেন—প্রথম নবী আদম প্রথম গুনাহগার।
খ্রিস্টানদের বক্তব্য—আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার কারণে গুনাহ করেছিলেন।
মওদূদী সাহেবের বক্তব্যও একই—জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া আদম আলাইহিস সালামের গুনাহ ছিল।

তাহলে দুই পক্ষের দাবি ও দলিল একই।

খ্রিস্টানদের বইয়ে বলা হয়েছে—প্রথম নবী আদম প্রথম গুনাহগার হওয়ার দলিল কোরআনে রয়েছে। কোরআন কি তাদের ধর্মগ্রন্থ, নাকি মুসলমানদের?

তারা দলিল হিসেবে পেশ করেছে—আল্লাহ জান্নাতে আদমকে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু আদম আল্লাহর নিষেধ অমান্য করে সেই গাছের ফল খেয়েছেন।

ঠিক একইভাবে মওদূদী সাহেবও তাফহীমুল কোরআনে আদম আলাইহিস সালামকে প্রথম গুনাহগার সাব্যস্ত করার জন্য জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার ঘটনাকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
খ্রিস্টানদের যে দাবি, মওদূদী সাহেবেরও সেই দাবি। খ্রিস্টানদের যে দলিল, মওদূদী সাহেবেরও সেই দলিল।

নবীগণকে গুনাহগার মনে করা ইসলামী মতবাদ কি না?

খ্রিস্টানদের বক্তব্য হলো—প্রথম নবী আদম প্রথম গুনাহগার। তাঁর গুনাহ ছিল জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, আদম আলাইহিস সালামের বংশে জন্মগ্রহণকারী অন্য নবীগণও গুনাহগার।
মওদূদীবাদী বক্তব্যেও নবীগণকে গুনাহগার সাব্যস্ত করার প্রবণতা রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো—নবীগণকে গুনাহগার মনে করা কি ইসলামী মতবাদ, না খ্রিস্টানদের মতবাদ?

উত্তর: খ্রিস্টানদের মতবাদ।

তাহলে প্রশ্ন—মওদূদী এই মতবাদ নিজে আবিষ্কার করেছেন, নাকি খ্রিস্টানদের কাছ থেকে আমদানি করেছেন?

উত্তর: খ্রিস্টানদের কাছ থেকে।

এবার আমরা ব্যাখ্যা করব।
মওদূদী এবং খ্রিস্টান—উভয়ের দাবি একই। তাঁদের দলিলও একই।|
প্রথম নবী আদম, প্রথম গুনাহগার—এই দাবি উভয়ের।
জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া আদমের গুনাহ ছিল—এ দাবিও উভয়ের।

জান্নাতের জীবনে গুনাহের প্রশ্ন

এখন আমরা বুঝার চেষ্টা করব—আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেলে তা কীভাবে বুঝতে হবে?
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মুফাসসিরীনে কেরাম তাঁদের তাফসিরের কিতাবে এই বিষয়টি আলোচনা করেছেন।
মানুষের দুনিয়ার জীবনে কোনো কাজ সওয়াবের হয়, কোনো কাজ গুনাহের হয়।
কিন্তু জান্নাতের জীবনের বিষয়কে দুনিয়ার জীবনের বিধানের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।

একটি উদাহরণ দেখুন।
দুনিয়ার জীবনে কোনো মুসলমান পুরুষ চারজনের বেশি স্ত্রীকে একসঙ্গে রাখতে পারে না। চারজনের বেশি স্ত্রী একসঙ্গে রাখা গুনাহ।
কিন্তু জান্নাতে একজন পুরুষকে সত্তর জন স্ত্রী দেওয়া হবে—এমন বর্ণনা হাদিসে এসেছে।
যেখানে দুনিয়ায় চারজনের বেশি স্ত্রী রাখা গুনাহ, জান্নাতে সেই সংখ্যা গুনাহ হবে না কেন?
কারণ জান্নাতের বিধান দুনিয়ার বিধানের মতো নয়।

ঠিক তেমনিভাবে আদম আলাইহিস সালাম যখন জান্নাতে ছিলেন, তখন জান্নাতের সেই জীবনের ঘটনাকে দুনিয়ার জীবনের গুনাহের বিধানের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।
সুতরাং জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার ঘটনাকে দুনিয়ার গুনাহের বিধান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়।
এই ব্যাখ্যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মুফাসসিরগণের তাফসিরের কিতাবে পাওয়া যায়।

ভুলে যাওয়ার বিষয়

আরেকটি বিষয় হলো—দুনিয়ার জীবনেও কেউ যদি আল্লাহর নিষেধের কথা ভুলে গিয়ে কোনো কাজ করে ফেলে, তার হুকুম আলাদা।
যেমন রোজাদারকে আল্লাহ দিনের বেলায় পানাহার করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু কোনো রোজাদার যদি নিজের রোজার কথা ভুলে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে ফেলে, তাহলে কি তার গুনাহ হবে?
হবে না।
কারণ সে ভুলে গেছে।
ঠিক তেমনিভাবে আদম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে কোরআনে এসেছে—«فَنَسِيَ وَلَمْ نَجِدْ لَهُ عَزْمًا» তিনি ভুলে গিয়েছিলেন।
সুতরাং ভুলে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।

প্রথম নবী ও শেষ নবীকে অপরাধী সাব্যস্ত করার অভিযোগ

তাফহীমুল কোরআনের প্রথম পারায় প্রথম নবী আদম আলাইহিস সালামকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে—এমন অভিযোগ করা হয়। আবার কোরআনের শেষ পারার সূরাগুলোর একটি সূরায় «وَاسْتَغْفِرْهُ» শব্দ রয়েছে।
‘ইস্তিগফার’ অর্থ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
প্রশ্ন করা হয়—যদি গুনাহ না করে থাকেন, তাহলে কেন ক্ষমা চাইবেন?
এটি ইসলামী যুক্তি নয় যে, শুধু অপরাধ করলেই ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষমা প্রার্থনার আরও বিভিন্ন অর্থ ও কারণ থাকতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে দেখুন—আপনি ইস্তিঞ্জাখানায় গেলেন। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় যে দোয়া পড়েন, তার শুরুতেই রয়েছে—«غُفْرَانَكَ» অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’

আপনি সেখানে পেশাব করেছেন—এ কারণে কি অপরাধ করেছেন?
পায়খানা করেছেন—এ কারণে কি গুনাহ করেছেন?

না।

তাহলে কেন ‘গুফরানাক’ বললেন?
খানে অন্য একটি বিষয় রয়েছে।

আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত ও ইস্তিগফার

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের অসংখ্য অগণিত নিয়ামতের মধ্যে আমরা সদা-সর্বদা ডুবে আছি।
একটি মুহূর্তও এমন যায় না, যখন আমরা আল্লাহর কোনো না কোনো নিয়ামত ভোগ করছি না।
প্রতি সেকেন্ডে আমরা নাক দিয়ে শ্বাস নিচ্ছি এবং ছাড়ছি। এর মাঝখানে যদি শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে জীবন শেষ হয়ে যাবে।
আপনি বেঁচে আছেন কীভাবে?
নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার মাধ্যমে।
কত ঘণ্টা পর একবার শ্বাস নেন?
কত মিনিট পর একবার শ্বাস নেন?
না—মুহূর্তে মুহূর্তে।
আপনি যখন ঘুমিয়ে থাকেন, তখনও আপনার নাক দিয়ে বাতাস ঢুকে এবং বের হয়। কার ইচ্ছায়?
আল্লাহর ইচ্ছায়।
আপনি ঘুমন্ত অবস্থায় শ্বাস নিচ্ছেন এবং ছাড়ছেন বলেই জীবিত আছেন।
এটি কি আল্লাহর একটি নিয়ামত নয়?
আমরা আল্লাহর নিয়ামত কয়েক মিনিট পরপর নয়, কয়েক ঘণ্টা পরপর নয়—প্রতিটি মুহূর্তে ভোগ করছি।
তাই বিবেক বলে—প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর গুণগান করা দরকার। প্রতিটি মুহূর্তে আলহামদুলিল্লাহ বলা দরকার, সুবহানাল্লাহ বলা দরকার, আল্লাহু আকবার বলা দরকার।

কিন্তু আপনি যখন ইস্তিঞ্জাখানায় প্রবেশ করলেন, সেখানে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা সমীচীন নয়। আল্লাহর পবিত্র নামের মর্যাদা রক্ষার কারণে সেখানে আপনি আলহামদুলিল্লাহ বলতে পারলেন না।

সেখান থেকে বের হয়ে আপনি বললেন— غُفْرَانَكَ ‘হে আল্লাহ! আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’
এটি কি কোনো গুনাহের কারণে?

না।

বরং আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের যথাযথ শুকরিয়া আদায় করতে না পারার কারণে এক ধরনের বিনয় ও ইস্তিগফার।
ঠিক তেমনিভাবে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—«إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً»                    আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সত্তরের অধিকবার ইস্তিগফার করি।
যদি ইস্তিগফার শুধু গুনাহের কারণেই করতে হয়, তাহলে রাসূল প্রতিদিন এতবার ইস্তিগফার করবেন কেন?
এখানে অন্য বিষয় রয়েছে।

রাসূলের রিসালাতের দায়িত্বে ত্রুটির অভিযোগ

কিন্তু তাফহীমুল কোরআনে «وَاسْتَغْفِرْهُ» শব্দের ব্যাখ্যায় এমন বক্তব্য এসেছে—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ২৩ বছরের নবুয়তি জীবনে রিসালাতের দায়িত্ব পালনে যেসব ত্রুটি হয়েছে, সেসবের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে।

এখন বিষয়টি আবার পরিষ্কার করে বুঝতে হবে।
রিসালাতের দায়িত্ব কী?
আল্লাহ রাসূলকে বলেছেন—আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা কিছু নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দিন।
আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলের কাছে ওহি নাজিল করা হয়েছে।
ওহি দুই প্রকার—এক প্রকার ওহি মাতলু, অর্থাৎ কোরআন; আরেক প্রকার ওহি গায়রে মাতলু, অর্থাৎ হাদিস।

সুতরাং সারকথা হলো—আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরআন-হাদিসের যে নির্দেশনা এসেছে, তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া রাসূলের রিসালাতের দায়িত্ব। কোনো কথা পৌঁছানো বাকি থাকলে রিসালাতের দায়িত্ব পালন সম্পন্ন হয় না।

আমার ছাত্র ভাইদের এই কথাটি গুরুত্বের সঙ্গে মনে রাখতে হবে—আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত কোরআন-হাদিসের বিধান মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া রিসালাতের দায়িত্ব।

এখন যদি বলা হয়, রাসূল রিসালাতের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছিলেন, তাহলে প্রশ্ন হলো—তিনি কী কথা পৌঁছানো বাকি রেখেছিলেন?
যদি কোনো কথা পৌঁছানো বাকি থাকে, তাহলে আরাফার ময়দানে রাসূল কীভাবে দাবি করলেন—আমি কি সব কথা পৌঁছে দিয়েছি?
সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে সাক্ষ্য দিলেন—হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন?
আর আল্লাহ তাআলা কীভাবে সেই দাবিকে সত্যায়ন করলেন?

তিনটি সত্য
আরাফার ময়দানে তিনটি বিষয় ছিল—
প্রথমত: রাসূলের দাবি—আমি সব কথা পৌঁছে দিয়েছি।
দ্বিতীয়ত: সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য—হ্যাঁ, আপনি পৌঁছে দিয়েছেন।
তৃতীয়ত: আল্লাহর সত্যায়ন—আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।
অতএব, যদি বলা হয় রাসূল রিসালাতের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছেন, তাহলে রাসূলের সেই দাবি মিথ্যা সাব্যস্ত করতে হয়।

সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য মিথ্যা সাব্যস্ত করতে হয়।
এবং আল্লাহর সত্যায়নকেও মিথ্যা সাব্যস্ত করতে হয়।
একটি ব্যাখ্যা গ্রহণ করার কারণে তিনটি মহাসত্যকে মিথ্যায় পরিণত করার প্রয়োজন পড়ে।
রাসূলের দাবি, সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য এবং আল্লাহর সত্যায়ন—এই তিনটি বিষয় সামনে রেখে আমাদের বিচার করতে হবে।

যে মতবাদ গ্রহণ করলে রাসূলের দাবি মিথ্যা হয়, সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্য মিথ্যা হয় এবং আল্লাহর সত্যায়ন মিথ্যা হয়, সেই মতবাদ সম্পর্কে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা দরকার।

আলোচনার উপসংহার

আমি শুরুতেই বলেছিলাম, তিলাওয়াতকৃত আয়াতের তিনটি কথা আমাদের ব্যাখ্যাসাপেক্ষে বুঝতে হবে।

একটি হলো—‘আজ’ বলতে আল্লাহ কোন দিন বুঝালেন?
দ্বিতীয়টি হলো—‘দ্বীন’ বলতে আল্লাহ কী বুঝালেন?
তৃতীয়টি হলো—‘পরিপূর্ণ’ বলতে কী বুঝালেন?
আজ আমি শুধু প্রথম বিষয়—‘আজ’ বলতে আল্লাহ কোন দিন বুঝালেন—এটি নিয়ে আলোচনা করেছি।

রাসূলের বিদায় হজের দিন, জিলহজ মাসের ৯ তারিখ, শুক্রবার—আরাফার ময়দানে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাবি করেছিলেন, তিনি আল্লাহর সব কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরাম তাঁর দাবির পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।
রাসূল আল্লাহকে সাক্ষী করেছিলেন।
এরপর আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজিল করে সেই বিষয়কে সত্যায়ন করেছেন—«الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ» আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।

কিন্তু তাফহীমুল কোরআনের কিছু ব্যাখ্যার কারণে—আমার আলোচনার ভাষায়—রাসূলের দাবিকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে হয়, সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষ্যকে মিথ্যা সাব্যস্ত করতে হয় এবং আল্লাহর সত্যায়নকেও মিথ্যা সাব্যস্ত করতে হয়।

এই পর্যায়ে আজকের আলোচনা শেষ করছি।

বাকি দুটি বিষয়—‘দ্বীন’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে এবং ‘পরিপূর্ণ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে—এগুলো নিয়ে অন্য সময় আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব বিষয় মুসলিম সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও উস্তাদদের এসব মতবাদ সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সবাইকে সতর্ক থাকা দরকার এবং অন্যদেরও সতর্ক করা দরকার।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভ্রান্ত মতবাদ থেকে হেফাজত করুন এবং সত্যকে সত্য হিসেবে বোঝার ও গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

Facebook
Twitter
LinkedIn
Skype
WhatsApp
Email
Print