জগদ্বিখ্যাত আলিম শাইখুল হাদীস হাফেয মুফতী আহমদুল্লাহ রাহ.

—আশরাফ আলী নিজামপুরী
১৯৩৮ ঈ. সনে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া পৌরসভার নিকটবর্তী ‘নাইখাইন’ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তাঁর পিতা মাওলানা ঈসা রাহ. এর কাছে নাযেরা সম্পন্ন করে হিফযের জন্য প্রথমে জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়াতে ভর্তি হন। অতঃপর জিরি মাদরাসার হিফযখানায় ভর্তি হয়ে কুরআন হিফয সম্পন্ন করেন।
মাত্র দশ বছর বয়সে (১৯৪৮ ঈ.তে) হিফজ সম্পন্ন করে তিনি জিরি মাদরাসায় কিতাব বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখানেই দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন।
শাইখুল হিন্দ আল্লামা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রাহ. এর সুযোগ্য শাগরেদ আল্লামা আব্দুল ওয়াদুদ সন্দ্বীপী রাহ. এর নিকট তিনি বুখারী শরীফ এবং তিরমিযী শরীফ পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।
আল্লামা মুফতী আহমদুল্লাহ রাহ. ছিলেন অতি সরল ও সাধাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তিনি ১৯৬৩ ঈ.তে জিরি মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস সম্পূর্ণ করে সেখানের গ্রন্থাগারে এক বছর গবেষণায় মগ্ন ছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের ‘জামিয়া আশরাফিয়া, লাহোর’এ পুনরায় দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন এবং দাওরায়ে হাদীসের বাৎসরিক পরীক্ষায় রেকর্ডসংখ্যক নম্বর অর্জন করে ‘মুমতায’ মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ হন।
জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে তাঁর উস্তাযদের মধ্যে ছিলেন শাইখুত তাফসীর আল্লামা ইদরীস কান্ধলভী রাহ., ইমামুল মা‘কুলাত আল্লামা রাসূল খাঁ রাহ., মাওলানা ফয়েয আলী শাহ রাহ. এবং ক্বারী হাফেয উবায়দুল্লাহ রাহ.। এছাড়াও মুনাযিরে ইসলাম আল্লামা খাইর মুহাম্মদ জালন্ধরী রাহ.ও তাঁর উস্তায ছিলেন।
লাহোরে দাওরায়ে হাদীস শেষ করার পর তিনি পাকিস্তানের মুলতান শহরের প্রসিদ্ধ মাদরাসা ‘জামিয়া খাইরুল মাদারিস’-এ ভর্তি হয়ে “ফুনুনাতে আলীয়া” সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে দারুল উলূম করাচির ফতোয়া বিভাগে ভর্তি হয়ে পাকিস্তানের মুফতিয়ে আযম মুফতী শফী রাহ. এর কাছ থেকে ফিকহ ও ফতোয়ার জ্ঞান অর্জন করেন।
পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে তিনি তৎকালীন জিরি মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা মুফতী নূরুল হক রাহ. এর আহ্বানে সেখানে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
১৯৬৭ ঈ. থেকে ১৯৯২ ঈ. সন পর্যন্ত প্রায় ২৫ বছর তিনি জিরি মাদরাসায় সাফল্যের সাথে শিক্ষকতা করেন। সেখানে তিনি বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ, শামায়েলে তিরমিযী, নাসাঈ শরীফ, ইবনে মাজাহ, মুআত্তা, মেশকাত, সুল্লামুল উলূম, মুখতাসারুল মাআনী, শরহে জামী সহ বিভিন্ন কিতাব অত্যন্ত সুনামের সাথে পাঠদান করেন।
১৯৯২ ঈ.তে পটিয়ার হাজী ইউনুস সাহেব রাহ. এর আহ্বানে তিনি জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় শাইখুল হাদীস পদে যোগদান করেন। তখন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় তেত্রিশ বছর তিনি জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় শাইখুল হাদীস এবং পরবর্তীতে সদরুল মুদাররিসীন পদে দায়িত্ব পালন করেন।
জামিয়া ইসলামিয়া জিরি মাদরাসায় শিক্ষক থাকা অবস্থায় তিনি ঢাকায় হযরত হাফেজ্জী হুজুর রাহ. এর খানকায় মাসব্যাপী তাঁর সুহবতে ছিলেন অতঃপর তিনি তাঁর খিলাফত প্রাপ্ত হন।
.
হযরত রাহ. এর শূন্যস্থান পূরণ হওয়ার নয়। আমি অধম বিভিন্ন সময়ে তাঁর সুহবত অর্জনের সৌভাগ্য লাভ করেছি। ফিকহ ও ফতোয়ায় তাঁর গভীর জ্ঞান আমাকে সর্বদা মুগ্ধ করেছে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। বিনয়ের এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। সত্যিই তিনি আধ্যাত্মিক জগতের এক নিরলস সাধক ছিলেন।
আমি তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ তা’আলা তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগানে পরিণত করুন। রাতের আঁধারে আকাশের তারকারাজি তাঁর কবরের প্রহরায় থাকুক।
তাঁর লিখিত কিতাব সমূহের মধ্যে চট্টগ্রামের বড় বড় মনীষীদের নিয়ে লেখা—‘মাশায়েখে চাটগাম’ আহলে ইলমদের নিকট খুবই সমাদৃত।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email
Share on print
Print